১৩ হাজার গাছ লাগিয়েছেন রিকশাচালক রেজাউল

সড়কদ্বীপে গাছ লাগাচ্ছেন রেজাউল
রিকশা চালানোর সামান্য আয়ে চলে মোহাম্মদ রেজাউলের সংসার। ঘরে স্ত্রী ও দুই মেয়ে; গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ মা। রিকশার প্যাডেলে পা চেপে ছুটে চলেন নগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। পেশা রিকশা চালানো হলেও রেজাউলের নেশা অন্য জায়গায়। ২৪ বছর ধরে রিকশা চালানোর পাশাপাশি তিনি সড়কের পাশে, সড়কদ্বীপে গাছ লাগিয়ে আসছেন।
রিকশার সিটের নিচে গাছের চারা নিয়ে ঘুরে বেড়ান রেজাউল। শুধু গাছের চারা রোপণ নয়, কোথাও ময়লার স্তূপ দেখলে নিজ হাতে তা পরিষ্কার করেন। সড়কে বড় গর্ত দেখলে রিকশায় করে ভাঙা ইট, কংক্রিট নিয়ে গিয়ে তা ভরাট করেন। ফুটপাত কিংবা সড়কের পাশে জায়গা পেলেই লাগান গাছের চারা। নিজের আয়ের টাকায় কেনেন গাছ, মাটি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
রেজাউলের দাবি, গত ২৪ বছরে তিনি নগরের বিভিন্ন এলাকায় ১৩ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছেন। প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা তিনি এসব কাজে ব্যয় করেন।
রেজাউলের রিকশার সিটের নিচে রাখা আছে একটি পুরনো নোটখাতা; তার দীর্ঘদিনের কাজের হিসাবের খাতা। কোনদিন, কোথায়, কতটি গাছ লাগিয়েছেন, কোথায় সড়কের গর্ত ভরাট করেছেন— এসবের হিসাব সেখানে লিখে রাখেন। রিকশা চালানোর সময় কোথাও গর্ত, আবর্জনার স্তূপ দেখলে তা খাতায় লিখে রাখেন। পরে প্রস্তুতি নিয়ে সুবিধামতো সময়ে সেখানে গিয়ে গর্ত ভরাট বা আবর্জনা পরিষ্কার করেন তিনি।
গাছ লাগানোর জন্য কখনো নার্সারি থেকে চারা কিনে আনেন। আবার কখনো রাস্তার পাশে বা ডাস্টবিনের কাছে পড়ে থাকা চারা তুলে এনে নতুন জায়গায় রোপণ করেন। নিজের রিকশায় দূরের জায়গা থেকে মাটি এনে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে সড়কের পাশে গাছ লাগান।
‘আমি সময়টাকে আলাদা করে রাখি। গাছ লাগানো, পরিচর্যা করা, ময়লা পরিষ্কার করা কিংবা সড়কের গর্ত ভরাট— কাজের ধরন নির্ভর করে সেদিন কী চোখে পড়ছে তার ওপর’— বললেন রেজাউল।
নোয়াখালীর স্থায়ী বাসিন্দা রেজাউল থাকেন নগরের হালিশহর বি ব্লক এলাকায়। দুই মেয়েকে লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা আছে। নিজে বেশিদূর পড়তে পারেননি। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন বলে জানালেন। ৪০ ছুঁইছুঁই রেজাউল নোয়াখালী থেকে কাজের সন্ধানে চট্টগ্রাম আসেন। কিছু না পেয়ে ভাড়ার রিকশা চালান তিনি। এজন্য একবেলা রিকশা ভাড়া বাবাদ মালিককে দিতে হয় ১৩০ টাকা।
রিকশা চালিয়ে উপার্জন করা অর্থ থেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী গাছের চারা, মাটি ও অন্যান্য উপকরণ কেনেন। এসব কাজে পান মানসিক প্রশান্তি।
রেজাউল বললেন, ‘এটা আমার মনের আনন্দ। লাগানো গাছগুলোর পাশ দিয়ে যখন যাই, তখন ভালো লাগে। এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
এ কাজ করতে গিয়ে মানুষের কটূক্তিও শুনতে হয়েছে রেজাউলকে। তবে এতে থামেননি তিনি। কারণ রেজাউলের কাছে এ কাজ কোনো পদ-পদবি, পুরস্কার কিংবা পরিচিতির জন্য নয়।



