মাউশির ৩ সাবেক ডিজিকে বেতন দিতে হচ্ছে বসিয়ে বসিয়ে
- শীর্ষ পদে ঘন ঘন পরিবর্তনে শিক্ষক নিয়োগ এমপিওভুক্তি এবং নীতি বাস্তবায়নে স্থবিরতা
- শ্রেণিকক্ষের বাইরে অলস সময় কাটানো কষ্টের ও মর্যাদাহানিকর— বলছেন সাবেক ডিজিরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পদ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি)। পদটি যেন এখন সংগীতের চেয়ারের মতো। মাত্র দুই বছরে চেয়ারছাড়া হয়েছেন আটজন। কেউ দায়িত্বে ছিলেন মাত্র ২০ দিন। কেউবা ছিলেন অতিরিক্ত দায়িত্বে, আবার দায়িত্ব হারিয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হয়েছেন তিনজন। শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পদ হারানো দপ্তরবিহীন এই তিন কর্মকর্তাকে বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিচ্ছে সরকার।
অলস সময় পার করা শিক্ষা ক্যাডারের এই তিন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের পদায়নে মূল বাধা পদমর্যাদা, জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক ভারসাম্যের জটিলতা। সাবেক ডিজিদের এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) এবং চেইন অব কমান্ড জটিলতায় কোনো দপ্তরে কাজ দিতে না পেরে বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেওয়া ছাড়া শিক্ষা প্রশাসনের সামনে এখন আর কোনো পথ খোলা নেই— এমনটিই জানালেন সংশ্লিষ্টরা।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মাউশির ডিজির পদ নিয়ে চলছে অস্থিরতা। দুই বছরে আট ডিজি পরিবর্তনকে স্বাভাবিক দেখছেন না প্রশাসনের কেউই। এর মধ্যে তিনজন হয়েছেন ওএসডি, একজনের চুক্তিভিক্তিক নিয়োগ বাতিল আর দুজন অতিরিক্ত দায়িত্বে। আবাক করা তথ্য হলো, একজন ছিলেন মাত্র ২০ দিনের ডিজি। মাউশির ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেনি আগে কখনো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মাউশি ডিজির পদটি গ্রেড ১ হলেও, শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ তৃতীয় গ্রেডের হওয়ায় পদায়ন করা হয় চলতি দায়িত্বে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, শিক্ষক পদায়নসহ ৪০০ ধরনের সেবা দিয়ে থাকে মাউশি। শীর্ষ পদে ঘন ঘন পরিবর্তনে থমকে গেছে প্রশাসনিক গতি। খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল গত এপ্রিল থেকে ডিজির দায়িত্বে থাকলেও ভেতরে ভেতরে চলছে অস্থিরতা। বদলি-পদায়ন, ১৪তম ব্যাচের সঙ্গে ডিজির ১৬তম ব্যাচের দ্বন্দ্ব আর অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ে বেকায়দায় বর্তমান ডিজিও। মাঝখানে তাকে সরিয়ে দেওয়ার খবর চাউর হলেও পরিস্থিতি আপাতত সামাল দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রীর সাবেক এক পিএস।
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেল, এখন পর্যন্ত ৪৮ জন দায়িত্ব পালন করেছেন মাউশির ডিজি পদে। শীর্ষ এই পদটিতে পদায়নের পর ওএসডি হওয়ার নেই নজির। প্রথমবারের মতো তিনজন ডিজি রয়েছেন ওএসডি অবস্থায়। তাদের নিয়ে বেকায়দায় মন্ত্রণালয়। কোথাও পদায়ন করতে গেলেই সামনে আসছে নানা জটিলতা। কারণ দেশের সব সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক এবং অধিদপ্তরে পরিচালকসহ সব কর্মকর্তার এসিআর লেখেন ডিজি। এ ছাড়া জেলা-উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসন এবং অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তদারকি করেন তিনিই। একসময় যিনি যাদের এসিআর লেখতেন, একই কাঠামোয় তাকেই অধীনস্থ পদে বসানো হলে প্রশাসনিক ভারসাম্যের পাশাপাশি আত্মমর্যাদার বিষয়টি সামনে আসছে। আর ওএসডিতে থাকা তিন ডিজিই ১৪তম বিসিএসের কর্মকর্তা, বর্তমান ডিজি ও পরিচালকরা ১৬তম ব্যাচের। এসব কারণে তাদের পদায়ন করতে আটকে যায় মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ এমন ঘটনা ঘটে অধ্যাপক বি এম হান্নানের ক্ষেত্রে। তাকে তিতুমীর কলেজে পদায়ন করেও এ জটিলতায় পরে করা হয় ওএসডি।
মাউশির এক পরিচালক আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপকালে বললেন, মহাপরিচালক পদে বসার পর কোনো কর্মকর্তাকে সাধারণ কলেজে পদায়ন তার জন্য মর্যাদাহানিকর ও বেমানান। অধীনস্থ বা সমপর্যায়ের কোনো পদে তাকে বসানো হলে কে তার এসিআর লিখবেন এবং তিনি কার এসিআর লিখবেন— এমন প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। শিক্ষা ক্যাডারে জ্যেষ্ঠতা গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক ডিজিকে এমন কোনো পদে দেওয়া হলো, যেখানে জুনিয়র কর্মকর্তা তার ঊর্ধ্বতন হবেন— সেক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
যেভাবে ওএসডি হন তিন ডিজি: চব্বিশের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চুক্তিভিক্তিক নিয়োগে থাকা নেহাল আহমদের চুক্তি বাতিল করে সরকার। যিনি ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ভাগ্নে। অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখার পরিচালক শফিউল আজমকে দেওয়া হয় অতিরিক্ত দায়িত্ব। পরের বছরের ২ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. এহতেশাম উল হককে করা হয় ডিজি। কিন্তু তিনি শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর আস্থাভাজন— জানাজানির পর বিতর্ক ওঠে। এ ছাড়া জুলাইয়ে আন্দোলনরত ছাত্রদের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এরপর তার প্রত্যাহার চেয়ে শিক্ষা ভবন ঘেরাও করে বিএনপপন্থী শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। ২০ দিনের মাথায় ওএসডি করা হয় তাকে। তারপর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সুপারিশে ১৪তম বিসিএসের কর্মকর্তা অধ্যাপক মুহাম্মদ আজাদ খান বসেন ডিজির চেয়ারে। যদিও তৎকালীন শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়ের ও শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে তিনিও ওএসডি হন মাত্র সাড়ে সাত মাসের মাথায়। তাকে সরানোর নেপথ্যে অন্য কারণ ছিল— ডিজি পদে আজাদ খান থাকাকালে নতুন ডিজির জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এটাকে অপমানজনক মনে করে আজাদ খান নিজ থেকেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন, যা আমলে নিয়ে তাকে ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর করা হয় ওএসডি। একই দিনে ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও কলেজ) অধ্যাপক বি এম হান্নানকে। তিনিও ১৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা। সাড়ে ছয় মাসের মাথায় বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১৫ মে তাকেও করা হয় ওএসডি। এই তিনজনই এখন ওএসডি অবস্থায় বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। অথচ মফস্বল এলাকার কলেজগুলো অধ্যাপক সংকটে।
ওএসডিতে থাকা কষ্টের— এমনটি অকপটে স্বীকার করে এহতেশাম উল হক আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমাকে যে অভিযোগে ওএসডি করা হয়েছে, সেটি ছিল প্রথম ভুল। আর দ্বিতীয় ভুল হলো, আমাকে নতুন করে কোথাও পদায়ন করতে না পারা। আমি শিক্ষক মানুষ, ক্লাসরুমে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ২০ দিন ডিজি ছিলাম, শুধু এ কারণে প্রায় দুই বছর ধরে ওএসডি করে ক্লাসরুমের বাইরে রাখা একজন শিক্ষক হিসেবে মেনে নেওয়া সত্যিই কষ্টের।’
একই ধরনের হতাশার চিত্র তুলে ধরলেন আরেক সাবেক ডিজি বি এম আবদুল হান্নান। বললেন, ‘শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পদ থেকে ওএসডি করার প্রথা আগে কখনোই ছিল না। তারপরও আমার ক্ষেত্রে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। আমাকে তিতুমীর কলেজে একজন সাধারণ শিক্ষক হিসেবে পদায়ন করার পর সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে— একজন প্রাক্তন ডিজি কীভাবে কলেজে সাধারণ শিক্ষক হয়ে যাবেন? ওই কলেজের সহকর্মী, ব্যাচমেট কিংবা জুনিয়র কর্মকর্তারাইবা কীভাবে গ্রহণ করবেন। সে জটিলতা ও প্রশাসনিক প্রশ্নের মুখেই আমাকে ওএসডি করা হয়। এখন দপ্তরবিহীন বসে বসে সময় পার করা ছাড়া আমার আর কী করার আছে।’
মাউশির মহাপরিচালক পদটি সরকারের গ্রেড ১ মর্যাদার হলেও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ তৃতীয় গ্রেডে আটকে যাওয়ায় ডিজি পদায়ন হয় চলতি দায়িত্বে। যদিও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে গ্রেড ১ মর্যাদা বাগিয়ে নিয়েছিলেন ফাহিমা খাতুন ও নেহাল আহমেদ।
দুই বছরে ৮ ডিজি: মাউশিতে এখন পর্যন্ত মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন ৪৮ জন। এর মধ্যে ২০১৮ সালে দায়িত্বে থাকাকালে মারা যান মাহবুবুর রহমান। বাকি ডিজিরা পদে থেকে স্বাভাবিক অবসরে গেছেন। চব্বিশের আগস্টের পর ডিজির পদে রদবদল হয়েছে আটবার। সবচেয়ে দীর্ঘ সময় পাঁচ বছর চার মাস মহাপরিচালক ছিলেন ড. আ হ ম করিম। ১৯৮৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নিয়ে ছিলেন ১৯৮৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। অন্যদিকে সবচেয়ে কম সময় ছিলেন এহতেশাম উল হক। ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি হন ওএসডি। অর্থাৎ মাত্র ২০ দিন ছিলেন ডিজির দায়িত্বে।
৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিপুল কর্মযজ্ঞের তদারকি করে মাউশি। ডিজি পদে বারবার পরিবর্তন, ওএসডি এবং দীর্ঘ সময় পূর্ণাঙ্গ ডিজি না থাকায় শিক্ষক নিয়োগ, এমপিওভুক্তি, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও অ্যাকাডেমিক সিদ্ধান্ত-নীতি বাস্তবায়নে সৃষ্টি হয়েছে স্থবিরতা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক আগামীর সময়কে বললেন, ‘শিক্ষা ক্যাডারে পদায়নে সিনিয়র-জুনিয়র বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হয়। শিক্ষা প্রশাসনে শীর্ষ পদে পদায়নের পর কাউকে কলেজ বা দপ্তরে পাঠানোতে জ্যেষ্ঠতা-সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে— এজন্য বিষয়টি বিবেচনা করছি।’



