বিশ্বকাপ ফুটবল
ছোট দেশের বড় কীর্তি

সংগৃহীত ছবি
আয়তনের দিক দিয়ে বিশ্বের অন্যতম ছোট একটি দেশ কেপ ভার্দে। আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটি সম্পর্কে বাংলাদেশের অনেক মানুষেরই হয়তো অজানা। তবে ছোট এ দেশটি ২০২৬ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করে ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা দেশগুলোর ভেতর কেপ ভার্দে জনসংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় এবং আয়তনের দিক থেকে দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। তাদের জনসংখ্যা মাত্র ৫ লাখ ২৫ হাজার, অর্থাৎ ঢাকা শহরের জনসংখ্যার একশ ভাগের এক ভাগও না। জনসংখ্যা ও আয়তনের দিক থেকে ছোট এ দেশটির বিশ্বকাপ খেলা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য ব্যাপার।
অন্যদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও নিজেদের ওপর যে তীব্র বিশ্বাস রেখেছিলেন কেপ ভার্দের ফুটবলাররা, তার প্রমাণ দেখা গিয়েছে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে। যেখানে ১০ ম্যাচে সাত জয় পেয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করেছে ব্লু শার্কসরা। ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ইসোয়াতিনিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার এই দেশ।
যেখানে ইতালির মতো বিশ্বজয়ী দল বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে র্যাংকিংয়ে ৬৯ নম্বরে থাকা দলটির এই সাফল্য অত্যন্ত গৌরবের। যে দেশটি ৪৫ বছর আগেও ফিফার সদস্য ছিল না, তারা এবার লড়াই করবে ফুটবল জগতের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের গ্রুপ পর্বে প্রতিপক্ষ স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরব। দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়নের এই গ্রুপে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়বে তারা। তবে এই কঠিন পথ পেরিয়ে নিজেদের সেরাটা দিতে নিশ্চয়ই পিছপা হবে না ছোট এ দেশটি। আগামী ১৫ জুন স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটবে কেপ ভার্দের।
ফুটবলে কেপ ভার্দের এই উত্থান শুরু বেশ কয়েক বছর আগেই। ২০১০ সালে তারা যে দেশ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল, সেই পূর্ণশক্তির পর্তুগালের সঙ্গে ০-০ গোলে ড্র করে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। সে সময় র্যাংকিংয়ে পর্তুগালের অবস্থান ছিল তৃতীয় এবং কেপ ভার্দের ১১৭তম। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ১ হাজার ৫৫৭ বর্গমাইলের এই দেশটিকে। ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো আফ্রিকান কাপ অব নেশন্সে কোয়ালিফাই করে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যায় তারা। তারপর ২০১৫ ও ২০২১ সালে অংশগ্রহণের পর ২০২৩ সালে আবার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে কেপ ভার্দে।
২০২৫ সালে ১১টি ম্যাচ খেলে সবকটিতে অপরাজিত ছিল কেপ ভার্দে। বিগত সময়ে তারা বেশকিছু শক্তিশালী দলের বিপক্ষে চমকপ্রদ পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।
কেপ ভার্দের এই সাফল্য এক দিনে আসেনি। সময়ের সঙ্গে তারা তাদের খেলায় পরিবর্তন এনেছে, যা লম্বা দৌড়ে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। ২০২০ সালে দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পাওয়ার পর বুবিস্তা দলের জন্য নতুন করে ছক এঁকেছেন। খেলোয়াড়দের গতি ও দক্ষতার এক চমৎকার রসায়ন তৈরি করেছেন এই ৫৬ বছর বয়সী।
কেপ ভার্দের ফুটবলে উত্থানের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো তাদের ‘ডায়াস্পোরা’ মডেল। এর শুরুটা হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে। ২০০৪ সালে তৎকালীন কোচ আলেক্সান্দ্রে আলহিনিও ইউরোপ জুড়ে ঘুরে কেপ ভার্দীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করেন। পর্তুগাল, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডসের রটারডাম শহর এবং লুক্সেমবার্গ ছিল তার প্রধান গন্তব্য। কারণটা সহজ— কেপ ভার্দের যত মানুষ বিদেশে থাকেন, তা দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এই বিশাল ডায়াস্পোরা থেকে ইউরোপের পেশাদার লিগে খেলা খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে আনাই হয়ে ওঠে কেপ ভার্দের মূল কৌশল।
পাশাপাশি পর্তুগালের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও ভাষাগত সংযোগের কারণে কোচিং, অবকাঠামো ও ক্লাব-সংযোগে ইউরোপীয় মানের প্রভাব পড়েছে।
ডায়াস্পোরা মডেলের পরবর্তী কোচরা রিকার্দো দা রোশা, জোয়াও দে দেউস, লুসিও আন্টুনেস— সবাই এ ধারা অব্যাহত রাখেন। ফলে আজকের দলে বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, মিশর এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের এমএলএস থেকেও খেলোয়াড় এসেছেন। তাদের বেশিরভাগই ইউরোপের পেশাদার পরিবেশে বড় হয়েছেন। তাই কৌশলগত পরিপক্বতা ও শারীরিক প্রস্তুতিতে তারা অনেক বড় দেশের খেলোয়াড়দের সমান।
কেপ ভার্দের ধারাবাহিক সাফল্য দলের আত্মবিশ্বাস ও ফুটবল সংস্কৃতি দুটিই গড়ে তুলেছে। সব মিলিয়ে মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যার এই দ্বীপরাষ্ট্র প্রমাণ করল— আয়তন এবং জনসংখ্যা যতই সীমিত হোক, তা কখনো চূড়ান্ত সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না।





