তিন পেসারের তিন ত্যাগ

ক্রিকেট খেলায় ভালো খেললে হাততালির অভাব হয় না। কিংবদন্তি থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক সবার মুখেই শোনা যায় জয়ধ্বনি। এর বিপরীতটা হলে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। শুধু ক্রিকেট নয় অন্যান্য খেলায়ও ঠিক একই নিয়ম। কিন্তু ভালো-খারাপ পারফরম্যান্স ছাপিয়ে খেলোয়াড়দের যেই নীরব ত্যাগ সেটা তেমন বিবেচিত হয় না। আব্রাহাম লিংকনের ভাষায়, ‘লোকে তোমার সাফল্যের পেছনের ত্যাগটা দেখে না, তারা শুধু মুকুটটি দেখে।‘
এই ধরুন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে সবাই পেস আক্রমণকে বাহবা দিতে ব্যস্ত। কিন্তু তারা যেই ত্যাগ স্বীকার করে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে রূপকথা রচনা করেছেন তা হয়ত অনেকের কাছেই অজানা।
মারারা স্টেডিয়ামে যখন জয়ের উৎসব চলছিল তখন তিন বাংলাদেশি পেসার—তাসকিন আহমেদ, এবাদত হোসেন ও হাসান মাহমুদের সিদ্ধান্তগুলোও এই জয়ের গল্পের অংশ হয়ে উঠেছিল। ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ও আর্থিকভাবে লাভজনক সুযোগকে পাশ কাটিয়ে তারা বেছে নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট সিরিজকে।
প্রথমবার বাবা হতে যাচ্ছেন ইবাদত হোসেন। এই জন্য পরিবারের সঙ্গে থাকতে ইতালি গিয়েছিলেন তিনি। শুরুতে অস্ট্রেলিয়া সফরেই তার থাকার কথা ছিল না। কিন্তু নাহিদ রানা ও শরিফুল ইসলামের চোটে বাংলাদেশের পেস বিভাগে তৈরি হয় সংকট। এরপর পিতৃত্বকালীন ছুটি সংক্ষিপ্ত করে জাতীয় দলের দায়িত্বে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন ইবাদত। ২৯ জুলাই ঢাকায় ফেরার কথা ছিল তার। অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দলের রওনা হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে।
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পরিবারের সঙ্গে মূল্যবান সময় কাটানোর সুযোগ ছেড়ে দেশের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন ইবাদত। শেষ পর্যন্ত সেই ত্যাগের অংশীদার হয়েই দেখলেন ঐতিহাসিক জয়।
লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে জাফনা কিংসের সঙ্গে চুক্তি ছিল তাসকিন আহমেদের। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্রও পেয়েছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট সিরিজের প্রস্তুতিতে টি-টোয়েন্টির ব্যস্ত সূচি যেন প্রভাব না ফেলে সে কারণে নিজেই টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
এর পেছনে ছিল বাস্তব হিসাব। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টানা ছয় ম্যাচ খেলে এসেছিল বাংলাদেশ। এরপর এলপিএলের আরও চার ম্যাচ খেললে অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে বিশ্রাম ও প্রস্তুতির জন্য খুব বেশি সময় থাকত না। তাসকিন জানতেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট থেকে পাওয়া আর্থিক সুবিধা ছেড়ে দেওয়ার অর্থনৈতিক ক্ষতি আছে। তবু অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট সিরিজকে তিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন।
তাসকিন যখন এলপিএল শুরুর আগেই সরে দাঁড়িয়েছিলেন, হাসান মাহমুদ তখন টুর্নামেন্ট চলার মাঝপথেই ফিরে আসেন। ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট খেলে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জনের পর এলপিএলে যোগ দিয়েছিলেন হাসান। কিন্তু বাংলাদেশের পেস আক্রমণ চোটে দুর্বল হয়ে পড়ায় টুর্নামেন্টের মাঝপথেই শ্রীলঙ্কা ছাড়েন তিনি। ফিরে আসেন অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রস্তুতি নিতে।
হাসানের ফিরে আসাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়ার। প্রথম ইনিংসে ক্যারিয়ারসেরা ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট তুলে নেন তিনি। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে আরও ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচে মোট ৯ উইকেট শিকার করেন। ম্যাচসেরার পুরস্কারও তার হাতেই ওঠে। ব্যক্তিগত ত্যাগকে এভাবেই অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্সে পরিণত করেন হাসান।
এবাদত, তাসকিন ও হাসানের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে অনেক দূরে। কিন্তু ডারউইনে যখন বাংলাদেশ এমন এক অবিশ্বাস্য জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ল তখন সেই ত্যাগগুলোও ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল।






