টেস্ট ইতিহাসের কুখ্যাত দশটি কেলেঙ্কারি ও বিতর্ক

বল টেম্পারিংয়ের কথা স্বীকার করে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন স্টিভেন স্মিথ এবং ডেভিড ওয়ার্নার।
ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা হিসেবে পরিচিত হলেও এর প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাসে এমন কিছু নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি ও বিতর্ক ঘটেছে, যা পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত টেস্ট সিরিজের প্রাক্কালে বিবিসি স্পোর্টসের ‘টেস্ট ম্যাচ স্পেশাল’ প্যানেল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে আলোড়ন সৃষ্টিকারী শীর্ষ ১০টি স্ক্যান্ডাল বা কেলেঙ্কারি বেছে নিয়েছে। ইতিহাসের পাতা থেকে সেই আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিবেদন:
১. বডিলাইন বিতর্ক (১৯৩২-৩৩)
অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি ব্যাটার ডন ব্র্যাডম্যানের রান উৎসব থামাতে ইংল্যান্ডের তৎকালীন অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন এক অভিনব ও আগ্রাসী কৌশল বেছে নেন, যা ক্রিকেটের ইতিহাসে ‘বডিলাইন’ নামে কুখ্যাত হয়ে আছে। সেই যুগে ব্যাটারদের শরীরে হেলমেট কিংবা আধুনিক কোনো সুরক্ষাবলয় ছিল না। জার্ডিনের নির্দেশে ফাস্ট বোলার হ্যারল্ড লারউড ও বিল ভস ব্যাটারদের শরীর লক্ষ্য করে একের পর এক বিপজ্জনক শর্ট পিচ বাউন্সার করতে থাকেন। এ কৌশলকে স্পিরিট অব ক্রিকেটের পরিপন্থী ও অখেলোয়াড়সুলভ বলে তীব্র সমালোচনা করা হয়। এ বিতর্ক শেষ পর্যন্ত দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ড ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েনে রূপ নিয়েছিল।
২. ডি’অলিভিয়েরা কাণ্ড (১৯৬৮)
বর্ণবাদের যুগে ১৯৬৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাওয়ার কথা ছিল ইংল্যান্ড দলের। দলে অন্তর্ভুক্তির দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া মিশ্র বর্ণের তারকা অলরাউন্ডার বাসিল ডি’অলিভিয়েরা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্টে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করা সত্ত্বেও তাকে প্রথমে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এ ঘটনা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। পরে ইনজুরিতে পড়া এক ক্রিকেটারের বদলি হিসেবে তাকে স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করা হলে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার আপত্তি জানায়। এ ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে সফরটি বাতিল করা হয়। পরে অলিভিয়েরা ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা শুরু করেন। এ ঘটনার পর প্রায় দুই দশক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে দক্ষিণ আফ্রিকা।
৩. হেডিংলিতে পিচ খুড়ে ফেলা: ‘জর্জ ডেভিস নির্দোষ’ (১৯৭৫)
১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডের হেডিংলিতে অনুষ্ঠিত অ্যাশেজ সিরিজের তৃতীয় টেস্টের চতুর্থ দিনে রোমাঞ্চকর এক সমাপ্তির অপেক্ষা ছিল। কিন্তু রাতে হঠাৎ করেই কে বা কারা পিচ কুপিয়ে সেখানে তেল ঢেলে দেয়! মাঠের প্রাচীরে লিখে দেওয়া হয় ‘জর্জ ডেভিস নির্দোষ’। জর্জ ডেভিস নামের ওই ব্যক্তি সশস্ত্র ডাকাতির মামলায় সাজা পেয়েছিলেন। কোনো অকাট্য প্রমাণ ছাড়াই শুধু বিতর্কিত এক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে ১৯৭৫ সালে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ভাঙচুরের কারণে ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয় এবং অস্ট্রেলিয়া সিরিজ নিজেদের করে নেয়। পরে ডেভিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় ২০১১ সালে তার সাজা সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়। অবশ্য ১৯৭৭ সালে সাইপ্রাস ব্যাংকে আরেকটি ভিন্ন ডাকাতির ঘটনায় যুক্ত থাকার অপরাধে ডেভিস পুনরায় গ্রেপ্তার হন এবং সাজা ভোগ করেন।
৪. ক্যারি প্যাকারের ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেট (১৯৭৭-৭৯)
অস্ট্রেলিয়ার ধনকুবের ক্যারি প্যাকার যখন তার টিভি নেটওয়ার্কের রেটিং বাড়াতে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের কাছে লাইভ ক্রিকেটের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হন। তখন তিনি নিজেই গড়ে তোলেন বিকল্প টুর্নামেন্ট ‘ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেট’। বিশ্বের সেরা ক্রিকেটারদের লোভনীয় চুক্তিতে নিজের দলে ভেড়ান তিনি। এদের মধ্যে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক টনি গ্রেগও ছিলেন। এই বিদ্রোহের ফলে বিশ্ব ক্রিকেটে প্রচলিত কাঠামোর বাইরে রঙিন পোশাক ও ফ্লাডলাইটের নিচে ক্রিকেটের প্রচলন শুরু হয়। পরে বোর্ডের সঙ্গে সমঝোতা হলেও এ বিদ্রোহ আধুনিক ক্রিকেটের বাণিজ্যিক রূপ পরিবর্তনে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। ৫. মাইক গ্যাটিং ও শাকুর রানা বিতর্ক (১৯৮৭)
১৯৮৭ সালে পাকিস্তান সফরে গিয়ে আম্পায়ারিং নিয়ে ঝামেলায় পড়েছিল ইংল্যান্ড দল। ফয়সালাবাদে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় দিনে ফিল্ডিং পজিশন নিয়ে ইংল্যান্ডের তৎকালীন অধিনায়ক মাইক গ্যাটিংয়ের সঙ্গে তীব্র বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন স্থানীয় আম্পায়ার শাকুর রানা। ঘটনার পরদিন ক্ষুব্ধ শাকুর রানা মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানান, ফলে পুরো দিন খেলা বন্ধ থাকে। খেলা পণ্ড হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও শেষ পর্যন্ত কূটনীতির মাধ্যমে সিরিজ বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল। তবে দুদেশের ক্রিকেট সম্পর্কে এ ঘটনার রেশ দীর্ঘদিন রয়ে গিয়েছিল।
৬. মাইক আথারটনের পকেটে মাটি বিতর্ক (১৯৯৪)
লর্ডসে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট চলাকালীন টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়েন ইংল্যান্ডের তৎকালীন অধিনায়ক মাইক আথারটন। পকেট থেকে মাটি বা ধূলা বের করে বলের একপাশে ঘষে বলের অবয়ব পরিবর্তনের চেষ্টা করছিলেন তিনি। ম্যাচ রেফারি ও সংবাদমাধ্যমের সামনে আথারটন দাবি করেছিলেন যে তার হাত শুকনো রাখার জন্য তিনি ওই মাটি ব্যবহার করছিলেন। এ ঘটনায় বিশ্ব জুড়ে তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে। শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক পদ থেকে পদত্যাগের গুঞ্জন উঠলেও শেষ পর্যন্ত শুধু জরিমানা দিয়েই রক্ষা পান তিনি এবং আরও চার বছর নেতৃত্ব চালিয়ে যান।
৭. হ্যান্সি ক্রনিয়ের ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারি (২০০০)
দক্ষিণ আফ্রিকা তথা বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয় হ্যান্সি ক্রনিয়ের ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিকে। দেশটির অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সম্মানিত অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রনিয়ে ভারতীয় বুকিদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে ম্যাচ ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেঞ্চুরিয়নে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বৃষ্টিতে প্রায় পণ্ড হওয়া একটি টেস্টে ইংল্যান্ডের তৎকালীন অধিনায়ক নাসের হুসেনের সঙ্গে মিলে দুই দলই ইনিংস ছেড়ে দেওয়ার চুক্তি করেছিল, যা ছিল সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত। পরে অপরাধ স্বীকার করার পর ক্রনিয়েকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয় এবং ২০০২ সালে এক রহস্যময় বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।
৮. টেস্ট ক্রিকেটে একমাত্র বাজেয়াপ্ত ম্যাচ বা ফরফিটেড টেস্ট (২০০৬)
ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের শেষ টেস্টে বল বিকৃতির অভিযোগে পাকিস্তানের বিপক্ষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন অস্ট্রেলিয়ান আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার। চা বিরতির পর আম্পায়ারদের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানায় পাকিস্তান দল। দীর্ঘ বিভ্রান্তি ও নাটকীয়তার পর পাকিস্তান দল মাঠে ফিরে আসতে চাইলেও আম্পায়ার হেয়ার ও বিলি ডকট্রোভ ম্যাচটি ইংল্যান্ডের পক্ষে পরিত্যক্ত ও বিজয়ী ঘোষণা করেন। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এটিই একমাত্র ম্যাচ যা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। ৯. পাকিস্তানের স্পট-ফিক্সিং কেলেঙ্কারি (২০১০)
লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২০১০ সালের টেস্ট ম্যাচে ইচ্ছাকৃতভাবে নির্দিষ্ট ওভারে নো-বল করার অপরাধে বিশ্ব ক্রিকেটে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। একটি ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডের গোপন স্ট্রিং অপারেশনের মাধ্যমে ফাঁস হয় যে, ফিক্সিং চক্রের সঙ্গে তৎকালীন অধিনায়ক সালমান বাট, পেসার মোহাম্মদ আসিফ এবং ১৭ বছর বয়সী তরুণ পেসার মোহাম্মদ আমির এ দুর্নীতিতে যুক্ত ছিলেন। আইসিসি তাদের দীর্ঘমেয়াদি নিষিদ্ধ করে এবং পরে ব্রিটিশ আদালতের রায়ে তিন ক্রিকেটারেরই কারাদণ্ড হয়েছিল। ১০. বল বিকৃতি বা ‘স্যান্ডপেপারগেট’ কেলেঙ্কারি (২০১৮)
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা এটি। সে বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপ টাউন টেস্টে ফিল্ডিং করার সময় অজি ফিল্ডার ক্যামেরন ব্যানক্রফট বলের আকৃতি পরিবর্তন করতে পকেট থেকে হলুদ রঙের একটি ছোট শিরিষ কাগজ বের করে ঘষছিলেন। এ ঘটনা ক্যামেরায় ধরা পড়লে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ এবং সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারের পরিকল্পনায় অচেনা ক্রিকেটার বেনক্রফট এই জঘন্য কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক এ ঘটনায় স্মিথ, ওয়ার্নার ও বেনক্রফটকে নিষিদ্ধ করা হয়। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে স্মিথ-ওয়ার্নার ক্রিকেটে ফিরলেও বেনক্রফটের ক্যারিয়ার আর এগোয়নি। এ কেলেঙ্কারির প্রতিবাদ করেছিলেন খোদ অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল।













