আলোয় ফেরা সম্ভব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যে লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে একসময় ‘অতীতের গল্প’ ভেবে দেশের মানুষ স্বস্তি পেয়েছিল, সেই লোডশেডিং আজ আবার ফিরে এসেছে। আধুনিক সভ্যতায় বিদ্যুৎ নাগরিক জীবন ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কিন্তু বর্তমান জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার) ঘাটতি, যান্ত্রিক ত্রুটি ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম— সর্বত্রই ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার ওপর।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি ও আর্থিক সংকটের কারণে প্রকৃত উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম, বিশেষ করে গ্রীষ্মকাল ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা যখন ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়, তখন প্রায় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ডলার সংকটে কয়লা ও এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল পরিশোধ করতে না পারায় অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে দেশের জেলা, উপজেলা ও গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে, যার প্রভাব এখন শহরাঞ্চলেও বিস্তৃত।
লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদন থমকে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার সরবরাহ করতে পারছেন না। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহারের ফলে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্য ও সেবার প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমছে, যা দেশের রপ্তানি আয় ঝুঁকিতে ফেলছে।
অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে ইন্টারনেট সংযোগে বিঘ্ন ঘটায় ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পেশাজীবীরাও বৈশ্বিক বাজারে কাজ ও নির্ভরযোগ্যতা হারাচ্ছেন।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি ও আর্থিক সংকটের কারণে প্রকৃত উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম
কৃষিপ্রধান এই দেশে সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় আমন ও বোরো চাষে কৃষকের উৎপাদন খরচ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পোলট্রি ও ডেইরি শিল্পেও। খামারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ব্যাপক হারে মুরগি মারা যাচ্ছে এবং দুধ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পোলট্রি খাতে মাসিক ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীরা হিটস্ট্রোক এবং ডিহাইড্রেশনের মতো
মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। হাসপাতালের আইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অপরিহার্য হলেও দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাকআপ জেনারেটরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে, যা জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও এর প্রভাব সমান মারাত্মক। ইন্টারনেট বিভ্রাটের কারণে অনলাইন ক্লাস ও ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রম যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনই পরীক্ষার মৌসুমে রাতের বেলার লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও শারীরিক ক্লান্তি বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ মেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের পথকে রুদ্ধ করছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা অপরিহার্য।
লোডশেডিং সংকট সমাধানে সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমাতে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন জোরদার করা প্রয়োজন। এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে জলবিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ বাড়াতে হবে এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে সিস্টেম লস বা অপচয় কমাতে হবে।
লোডশেডিং কোনো সাময়িক সমস্যা নয়; বলা যায় এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গভীর কাঠামোগত সংকট। এই সংকট নিরসনে দ্রুত টেকসই জ্বালানি নীতি গ্রহণ না করলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রা স্থবির হয়ে পড়বে। দেশের মানুষ এখন একটি নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রত্যাশা করে। সময়োপযোগী সঠিক পদক্ষেপ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এই অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে ফেরা সম্ভব।
লেখক: শিক্ষক লক্ষ্মীপুর




