নেপথ্যে রাজনৈতিক ছত্রছায়া

আরাফাত শাহীন
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিশোরদের দ্বারা সংঘটিত এমন কিছু অপরাধ সামনে এসেছে, যা আমাদের কিশোর গ্যাং নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। একটি ঘটনায় দেখা যায়, স্কুলের প্রধান শিক্ষক কোনো অন্যায় কাজের জন্য ছাত্রদের শাসন করেছেন। এই ‘অপরাধে’ ছাত্ররা তাকে স্কুলে অবরুদ্ধ করে রেখে মোটরসাইকেল ভাঙচুর করছে! সামাজিক অবক্ষয়ের কী নিদারুণ চিত্র! আমরা যখন স্কুল কিংবা কলেজে পড়াশোনা করেছি, তখন কোনো শিক্ষককে চলার পথে পাশ কাটিয়েও যাইনি। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকেছি তাদের সামনে। শিক্ষকের সামান্যতম অমর্যাদা হয় এমন কোনো কিছু করা থেকেও আমরা সব সময় বিরত থেকেছি। আর বর্তমানে এসে কী দেখছি! স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়— সর্বত্রই ছাত্রদের দ্বারা শিক্ষকরা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। কোথাও আবার শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন।
অপর একটি ঘটনায় দেখা যায়, একটি গার্লস স্কুলের শিক্ষার্থীরা বখাটেদের ভয়ে বাড়ির পথে এগিয়ে যেতে সাহস পাচ্ছে না। দিনদুপুরে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্য ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করে চলেছে! আমরা ভাবতেও পারি না, আমাদের সমাজ নামতে নামতে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে! ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর কিশোর গ্যাংয়ের ওই সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা কি জানি, এ রকম কতশত ঘটনা প্রতিনিয়ত চোখের আড়ালে রয়ে যায়? সব ঘটনা তো আর সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা পত্রিকার পাতায় আসে না।
আমরা নারীদের উচ্চশিক্ষার কথা বারবার জোর গলায় বলি; অথচ তাদের জন্য নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন তৈরি করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। কিশোর গ্যাংয়ের অত্যাচারে কত কিশোরী অকালে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে, তার কোনো হিসাব কি আমরা রাখছি?
কিশোররা যাতে রাজনৈতিক দলের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে সেজন্য সজাগ থাকতে হবে
এভাবে প্রতিনিয়ত সমাজের প্রতিটি জায়গাতেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে চলেছে কিশোর গ্যাং। এরা সংঘবদ্ধভাবে চলাফেরা করে। দেশের প্রতিটি শহর, এমনকি গ্রামেও এদের দাপিয়ে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা চুরি, ছিনতাই, মাদক কারবারি, ধর্ষণ, খুনোখুনিসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা করছে না। তারপরও এদের বিরুদ্ধে জোরালো কোনো আইনি পদক্ষেপ দৃশ্যমান হচ্ছে না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তথাকথিত ‘বড় ভাই’ নামক একটা শ্রেণির পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা এরা পেয়ে থাকে। এই বড় ভাইয়েরা তাদের বলে, ‘তোমরা যত অপরাধ করো না কেন, আমরা তোমাদের পাশে আছি।’ কোনো ভয় নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যক্ষ ইশারায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রতিপক্ষের ওপর দেশি অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নানা সময়ে এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ব্যবহার করেছে। সবসময় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার ফলে তারা অপরাধ করতে আরও বেশি উৎসাহিত হয়।
কিশোর অপরাধের পরিমাণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। প্রতিদিন দেশের আনাচে-কানাচে যে অপরাধগুলো সংঘটিত হচ্ছে, খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে এদের প্রায় সবকটির সঙ্গেই কিশোর গ্যাং জড়িত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরাধ করেও বয়সের কারণে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে এরা বেরিয়ে যায়। আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এজন্য দেশের বিদ্যমান আইনে প্রয়োজন হলে সংস্কার করে এসব অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। শুধু বয়সের দোহাই দিয়ে কিশোর অপরাধীদের ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে এ ধরনের সমস্যাগুলো পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিশোররা যাতে কোনো রাজনৈতিক দলের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। সর্বোপরি সব পিতামাতাকে তার নিজ সন্তানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে; সুষ্ঠু পারিবারিক বন্ধনে তাদের আবদ্ধ করে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে। তবেই কিশোর অপরাধ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
লেখক: চাকরিজীবী, ফুলতলা, খুলনা




