খুন হয়ে যাই প্রতিদিন

সুমন্ত আসলাম। গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ছোট্ট একটি হিসাব
নগেন মুন্সী স্যার বাংলা দ্বিতীয় পত্র পড়াতেন আমাদের। কিন্তু মাঝে মাঝে কৌতূহল নিয়ে ছোট্ট একটা হিসাব কষতে দিতেন ক্লাসে। সবচেয়ে দুষ্টু ও দুরন্ত ভোলা আর ক্ষুদুকে একদিন বললেন, ‘বাবা ভোলানাথ আর ক্ষুদিরাম বাবু, সপ্তাহে অন্তত তিন দিন তোমরা বেঞ্চের ওপর কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকো।’ ঠোঁটের কোনায় স্মিত একটা হাসি নিয়ে স্যার এগিয়ে যেতেন ওদের দিকে, ‘সপ্তাহে তিন দিন হলে, মাসে কয়দিন হয় বাছাধন?’ দুজনের কেউই কোনো উত্তর দিত না। স্যার যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তার পাঠদানে অনেক উচ্চপদস্থ যে বসে আছেন দেশের এখানে-ওখানে, তাদের কাউকে না পেয়ে ডেকে আনতেন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর অর্থমন্ত্রীকে। স্মিত সেই হাসি ঠোঁটে তিনি বলতেন, ‘বাবারা, দেশে প্রতিদিন ১০টি করে খুন হচ্ছে, মাসে তাহলে মোট কতগুলো হচ্ছে?’
আমি নিশ্চিত— ভোলা আর ক্ষুদুর মতো কোনো উত্তর দিতেন না এ দুজনও।
অথচ প্রশ্নটা কত সহজ, উত্তরও নয় অজানা।
একটি মহাপাজল
বাতেন খুন হলো প্রকাশ্য দিবালোকে, রাস্তায়। সামনের দোকানদার দেখলেন, পাশ দিয়ে যাওয়া এক ডাক্তার দেখলেন, ওপাশে একটি বিল্ডিংয়ে তদারকি করা প্রকৌশলী দেখলেন, গাড়ির কালচেটে গ্লাস দিয়ে এক উচ্চপদস্থ দেখলেন, সাংবাদিক-লেখক-সংস্কৃতিবান-সমাজসেবক-বুদ্ধিজীবী এবং আরও অনেকে দেখলেন। একটু পর পুলিশ এসে সব দেখল। সব জানল থানায় গিয়ে। মামলাও হলো একসময়।
এখন পাজলটা হচ্ছে— ৯ বছরে কেউ ধরা না পড়লেও মামলার ফাইলের রঙটা কি ঠিক আছে এখনো? যে ধুলো জমেছে তার ওপর, তার ওজন কত হবে এখন?
জগতের প্রথম খুন
মা হাওয়া আর বাবা আদমের অনেক সন্তানের মধ্যে দুই সন্তান কাবিল ও হাবিল। বিয়েসংক্রান্ত এক ব্যাপারে বিবাদ সৃষ্টি হয় দুই ভাইয়ের মধ্যে। এরই জেরে একদিন ছোট ভাই হাবিলকে খুন করে বড় ভাই কাবিল।
বিখ্যাত সব খুন
জুলিয়াস সিজারকে খুন করা হয়েছিল ২৩ বার ছুরির আঘাতে। খুন করেছিলেন রোমান সিনেটের ব্রটাস আর ক্যাসিয়াস। আব্রাহাম লিংকনকে খুন করেন নাট্য অভিনেতা জন উইলকস, গুলি করে। নাথুরাম গডসে নামক এক হিন্দু জাতীয়তাবাদী হত্যা করেন মহাত্মা গান্ধীকে, ওই গুলি করেই। এক মোটর শোভাযাত্রায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। মার্টিন লুথার কিংকে হত্যা করেন জেমস আর্ল রে। নিজের দেহরক্ষীর হাতে খুন হন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।
খুন হন বাংলাদেশের দুই রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান আর জিয়াউর রহমানও।
একটু হাসি
থুতনিতে হাত ঠেকালেন বিচারক। একটু দূরে দাঁড়ানো আসামিকে বললেন, ‘তুমি কি সত্যিই মনে করো তুমি নির্দোষ?’
‘অবশ্যই। আমি তো শুধু ট্রিগার টিপেছি। ওই গুলি আর ট্রিগারটা তো আমার না, বন্দুকের। তাহলে আপনিই বলুন স্যার, আসল খুনিটা কে?’
উকিল আসামিকে বললেন, ‘আপনি তাহলে বলতে চাচ্ছেন, খুনি আপনি নিজে নন।’
‘জি।’
‘ব্যাখ্যা করুন।’
‘ফাঁকা রাস্তা দিয়ে মেয়েটি যাচ্ছিল। আমি শুধু তার সামনে গিয়ে ছুরিটা বের করেছি। ভয়ে-আতঙ্কে মেয়েটি জড়িয়ে ধরল আমাকে। আমার হাতের ছুরিটা ঢুকে গেল তার পেটে। কেন, আমাকে জড়িয়ে ধরল কেন সে? তাকে বলেছি আমাকে জড়িয়ে ধরতে? সে তো উল্টো পেছন দিকে দৌড়ে পালাতে পারত।’
খুন হয়ে যায় প্রতিশ্রুতি
জাহিদ বাবুকে সম্ভবত কারও মনে নেই আমাদের, মনে রাখার কথা নয়। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিহত হন তিনি, প্রায় দুই যুগ আগে। তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. নাসিম কুমিল্লায় এসে নিহত জাহিদ বাবুর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘মাটির নিচে থাকলেও বাবুর খুনিদের গ্রেপ্তার করা হবে।’
আমাদের জাঁদরেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবেগে কী ভুল একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন— খুনি তথা মানুষ কখনো মাটির নিচে থাকে না। তারা থাকে মাটির ওপরেই, সভা-সমাবেশে, মন্ত্রী-এমপির পাশে, মঞ্চের ব্যানার ঘেঁষে।
আর আমাদের শাহ এ এম এস কিবরিয়া যখন অর্থমন্ত্রী, খুন বেড়ে গেল তখন। মিডিয়া সরব, সভা-সমাবেশে আলোচনা-সমালোচনা। তিনি বিরক্ত হয়ে একদিন বললেন, ‘দু-একটা খুন হলে এমন কী হয়?’
না, কারও তেমন কিছু হয় না। যার খুন হয়, যিনি সন্তান হারান, বাবা কিংবা মা হারান, শুধু তার কিছু হয়। হয় হিরণপ্রভা দেবীর। ১৯৮১ সালে টাঙ্গাইলে সন্ত্রাসীর ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছিলেন তার ছেলে কল্যাণ বিহারী দাস। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তখন বলেছিলেন, ‘তার দল ক্ষমতায় গেলে কল্যাণ হত্যার বিচার হবে।’
সভাপতি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, একবার নয়, কয়েকবার। তারপর?
খুন নিয়ে বিরক্ত হওয়া শাহ এ এম এস কিবরিয়াও খুন হন একদিন!
খুন হচ্ছে যত্রতত্র
জ্যামিতিক হারে অপরাধ বাড়া নিয়ে ঢাবির সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক দুটি বিষয় ব্যাখ্যা করেছেন— এক. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, তারা তা নিতে পারছে না। দুই. অপরাধী গোষ্ঠী বা যারা অন্যায় ও অস্থিরতা তৈরি করে সুবিধা নিতে চায়, তারা নানাভাবে পাচ্ছে আশ্রয়-প্রশ্রয়।
খুন হচ্ছে রাস্তায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, প্রার্থনালয়ে, পরিবহনে, এমনকি খানিকটা নিরাপদ স্থান নিজের ঘরেও। কোথাও কারও মুক্তি নেই, স্বস্তি নেই।
কিন্তু আমরা যে প্রতি বছর ট্যাক্স দিই! সেই টাকায় বাজেট হয় আমাদের নিরাপদে রাখার। টাকা যায়, সময় যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়ে যায়, আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দুধভাত খায় খুনিগণ!
একটি ছোট্ট দাবি
সোনার এই বাংলায় যুগে যুগে নয়, বছরে বছরে পাঁচ বছরে একেকজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসেন, তারা বাণী দেন যত্ন করে— লুকিং ফর শত্রুস, আল্লার মাল আল্লা নিয়া গেছে, মাটির দশ হাত নিচে থেকেও খুনিদের বের করে আনা হবে।
প্রাণ হরণ করা, মন-জাগানিয়া, পুলকিতবোধ উদ্গিরণের এসব মুগ্ধকর বাণী আমরা প্রাণে স্থান দিয়েছি, মনে দাগ কেটে রেখে দিয়েছি, বালিশে মাথা রেখে বেড়ার ফাঁকে চাঁদ দেখতে দেখতে ঘুমিয়েছি, সকালে উঠে অন্ত্র-তন্ত্র পরিষ্কারও করেছি যথাস্থানে।
এভাবেই যাচ্ছে আমাদের, যাবে আজীবন।
আমারা চাই, আমাদের ছোট্ট একটা দাবি— খুন-টুন, অপরাধ-টপরাধ যতই বাড়ুক, আতঙ্কে ছেয়ে যাক চারপাশ, আমাদের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার সাবেকদের মতো একটি মোহনীয় বাণী দিক আমাদের। আমরা সেই বাণী শুনে নিশ্চিন্তে ঘুমাব। তার আগে সেই বাণীর ছবি-কার্ড বানিয়ে ছড়িয়ে দেব ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রামে। বাণীকে দৃশ্যরূপে সাজিয়ে প্রচার করব ইউটিউবে। আবৃত্তির ঢঙে ঘোষণা দেব গ্রাম-গঞ্জের মাইকে। প্রতিটি শহরের প্রতিটি বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং বোর্ড দখল করে সাঁটিয়ে দেব রিফলেকটিভ ভিনাইল রিভার্স প্রিন্টে।
তারপর বরাবরের মতো ঘুমিয়ে পড়ব আমরা রাক্ষস-খোক্কশের গল্পে, দুঃখিত উন্নয়নের গল্পে— এক দেশে না এক রাজা ছিল...।
মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণীটা পাচ্ছি তো!
শিগগির, না খুন-টুন আরও একটু বেড়ে গেলে?




