এআই-এর সর্বগ্রাসী বইক্ষুধা

কদিন ধরে একটা শোরগোল ইন্টারনেটে। শোনা যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্সের সর্বগ্রাসী ক্ষুধার বলি হচ্ছে পুরনো বইপত্র।
ব্যাপারটা এরকম যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্পর্শ পড়েনি— এমন বিশুদ্ধ ডেটা ইন্টারনেটে ফুরিয়ে আসছে। তাই এআই কোম্পানিগুলো এবার হাত বাড়িয়েছে পুরনো বইয়ের দিকে। তারা খুঁজে ফিরছে অতীতের ‘কুমারী’ বইপত্র। ‘কুমারী’ এই অর্থে যে এসব বই কখনও কোনো চ্যাটবটের খাদ্য হয়নি। এখন ভাঙা আলমারি ঘেঁটে, ধুলো ঝেড়ে নামিয়ে আনা হচ্ছে সেসব বই। তারপর? তারপর তাদের স্পাইন ছিঁড়ে, পৃষ্ঠা আলাদা করে, শিল্পকারখানার স্ক্যানারের নিচে শুইয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এগুলো রূপকধর্মী কথা। অতিকথন আছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু বাস্তবতা থেকে তা বেশি দূরবর্তীও নয়। এটি এখন প্রযুক্তি শিল্পের বাস্তবতা।
কী রকম?
গত কয়েক মাসে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু পুরনো বইয়ের ব্যবসায়ী অস্বাভাবিক এক ক্রেতার মুখোমুখি হয়েছেন। তারা একসঙ্গে শত শত, কখনও হাজার হাজার পুরনো বই কিনে নিচ্ছে। তাদের বিশেষ আগ্রহ ২০২২ সালের আগের ছাপা বইয়ে— বিশেষ করে একাডেমিক, ইতিহাস, আইন, ভাষা, অর্থনীতি, বিজ্ঞান এবং অন্যান্য নন-ফিকশন গ্রন্থে। বইগুলো সংগ্রহের পর অনেক ক্ষেত্রেই উপরে যেটা বললাম, সেটা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, মলাট কাটা হচ্ছে, স্পাইন বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে এবং প্রতিটি পৃষ্ঠা দ্রুতগতির স্ক্যানারে ডিজিটাইজ করা হচ্ছে। স্ক্যান শেষ হলে মূল বই আর সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো কাগজের মণ্ডে পরিণত হচ্ছে।
একসময় আমরা বই পড়তাম মানুষ হওয়ার জন্য। এখন বই পড়ছে মেশিন, আর তা মানুষের মতো হতে শেখার জন্য। পার্থক্য হলো, মানুষ বই পড়ে সেটা বুকশেলফে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু মেশিনের জন্য বইয়ের যাত্রা শেষ হচ্ছে স্ক্যানারের নিচে
এটা এখন আর কেবল গুজব নয়। এআই প্রশিক্ষণের জন্য বই সংগ্রহের একটি নতুন সরবরাহশিল্প গড়ে উঠছে। ISBNdb, BookData.ai-এর মতো প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যেই দাবি করছে, তারা লাখ লাখ বই সংগ্রহ করে এআই কোম্পানিগুলোর জন্য সরবরাহ করতে পারে। তাদের যুক্তি, ইন্টারনেটে পাওয়া লেখার চেয়ে বইয়ের ভাষা বেশি সম্পাদিত, নির্ভরযোগ্য, সুসংগঠিত এবং দীর্ঘ চিন্তার ফল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হঠাৎ বই কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে এআই-এর এক অদ্ভুত সংকটে। গত তিন বছরে ইন্টারনেট এমন গতিতে এআই ব্যবহার করে তৈরি করা লেখায় ভরে গেছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন মডেলগুলো ক্রমেই মানুষের লেখা আর মেশিনের লেখা একসঙ্গে খেয়ে বড় হচ্ছে। এর ফলে গবেষকেরা যে সমস্যার কথা বলছেন, সেটার নাম মডেল কলাপ্স। সহজ ভাষায়, একটি মেশিন যদি বারবার আরেকটি মেশিনের তৈরি লেখা থেকে শেখে, তাহলে ধীরে ধীরে তার ভাষা, তথ্য ও যুক্তির মান পড়ে যেতে থাকবে। যেভাবে ফটোকপির ওপর ফটোকপি করতে করতে মূল ছবিটাই ঝাপসা হয়ে যায়।
আমজনতার ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, ইন্টারনেটে ‘ফ্রেশ মাল’ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
আর এখানেই পুরনো বইয়ের মূল্য।
২০২২ সালের আগে প্রকাশিত অধিকাংশ বইপত্র কেন? কারণ, এগুলো এমন এক সময়ে লেখা, যখন লেখকরা ছিল মানুষ, সম্পাদকরা মানুষ, ভাষার পরিশোধনও মানুষের হাতেই হত। এআইয়ের কোনো ছাপ তখন কোথাও পড়েনি। ফলে এই বইগুলোকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দেখছে এক ধরনের ‘পরিষ্কার’ বা ‘দূষণহীন’ ভাষাগত খনি হিসেবে।





