গ্যাংস অব মোহাম্মদপুর

মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডে আমি বাসা ভাড়া নিয়ে ১৪ বছর ছিলাম। ফলে এই এলাকা আমার নিজের হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে আমার নাড়ির যোগ। একদিকে লালমাটিয়ার ছায়াঢাকা মহল্লা আর আরেকদিকে টাউন হল মার্কেটের হট্টগোলময় ব্যস্ততার মাঝখানে বহু স্মৃতি জমে উঠেছে আমার মধ্যে। এজন্য পত্রপত্রিকায় যখন দেখি মোহাম্মদপুরকে ‘অপরাধের স্বর্গরাজ্য’, ‘অপরাধের রাজধানী’ ইত্যাদি অভিধা দেওয়া হচ্ছে, তখন বুকের একটা কোনা চিনচিন করে ওঠে।
অপরাধ ঢাকা শহরের সব মহল্লায়ই হয়। শহর মাত্রই অপরাধ। কারণ, শহর বহু বিচিত্র মানুষ আর তাদের বিচিত্র আকাঙ্ক্ষাকে একপাত্রে নিয়ে আসে। বহু স্বপ্নকে ওপরতলা-নিচতলায় সাজিয়ে রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে মোহাম্মদপুর যে এক ভীষণ ত্রস্ত এলাকায় পরিণত হয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রাস্তাঘাটে ছিনতাই-রাহাজানি তো অবিশ্বাস্য মাত্রায় বেড়েছেই, সংঘবদ্ধ খুনোখুনিও নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার-পাঁচটি কিশোর বয়সী ছেলে খোলা তলোয়ার হাতে একটা কোনো অফিস বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে ম্যানেজারকে কুপিয়ে মেরে ফেলছে, সিসি ক্যামেরার এরকম দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মোহাম্মদপুরকে এক দুঃস্বপ্নের জনপদে পরিণত করেছে। সেটা এমনই ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন যে, ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ আর ‘সিটি অব গড’ সিনেমার কথা মনে করিয়ে দেয়।
প্রথম দর্শনে ‘সিটি অব গড’ সিনেমাকে একটা গ্যাংস্টার মুভি বলে মনে হলেও এর আসল নায়ক ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরের একটা মহল্লা, যাকে ষাটের দশক থেকে ‘সিদাদ দে দিউস’ বা ‘সিটি অব গড’ বলে ডাকা হতে থাকে। কারণ কী? কারণ, এলাকাটা সন্ত্রাসের মুক্তাঞ্চল।
এ সিনেমায় আমরা দেখি, কীভাবে রাষ্ট্রের দুর্বল উপস্থিতি, দারিদ্র্য, মাদক কারবার, অবৈধ অস্ত্র আর সহিংসতার সংস্কৃতি মিলেমিশে একটা মহল্লায় এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অপরাধ আর কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ। মোহাম্মদপুরের সঙ্গে ‘সিটি অব গডে’র মিল এখানেই যে, উভয় ক্ষেত্রে অপরাধীর পরিচয় আর মুখ্য নয়। বরং একটা সামাজিক-রাজনৈতিক ইকোসিস্টেম কী করে একটা মহল্লাকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে, তারই দৃষ্টান্ত যেন দুটি মহল্লা।
ভারতের ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ জেলার ওয়াসিপুর অঞ্চলের কয়লাখনি, শিল্পায়ন আর নগরায়ণের পটভূমিতে অনুরাগ কাশ্যপের সাড়া জাগানো মুভি ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ আমাদের মনে সহিংসতার এক দগদগে স্মৃতি তৈরি করে দিয়েছে। মোহাম্মদপুরের সঙ্গে এর কি কোনো মিল আছে? আছে। ‘ওয়াসিপুর’ কোনো সাধারণ গ্যাংস্টার মুভি নয়। এটা কোনো ফর্মুলা প্রতিশোধের গল্পও বলে না। বরং এটি দেখায় কীভাবে অপরাধ, রাজনীতি, ব্যবসা এবং স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামো একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা তৈরি করে। কয়লার অর্থনীতি যেমন ওয়াসিপুরের সহিংসতাকে টিকিয়ে রাখে, তেমনি যেকোনো শহরে অবৈধ অর্থনীতি, চাঁদাবাজি, মাদক, জমি দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ বা স্থানীয় প্রভাব বিস্তার অপরাধকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা থেকে একটি সংগঠিত সিস্টেমে রূপ দেয়।
মোহাম্মদপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকিয়ে আমরা যদি শুধু কয়েকজন কিশোর সন্ত্রাসীর রক্ত হিম করা কর্মকাণ্ড দেখি, তাহলে পুরো চিত্রটা ধরা পড়বে না। আমাদের যদি জানতে হয় কেন মোহাম্মদপুরের এ চেহারা তৈরি হলো, তাহলে বড় ছবিটা দেখতে পারতে হবে। মোহাম্মদপুরের ঘটনাগুলো শুধু থানা-পুলিশের অপরাধ তালিকা দিয়ে নয়, বরং একটি নগর-সমাজের দীর্ঘ বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পড়া দরকার।
আমার কাছে মোহাম্মদপুরে অপরাধের এ স্বর্গরাজ্য কোনো রহস্য নয়। কেউ যদি রিং রোডে গিয়ে সটান দাঁড়িয়ে পূর্বে আর পশ্চিমে তাকায়, পুরো ছবিটা তার কাছে পরিষ্কার ধরা দেবে। কারণ রিং রোডের দুপাশে দুই আলাদা মোহাম্মদপুর। এ দুই মোহাম্মদপুরের বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পূর্ণ আলাদা।
কথা হলো, আমরা মোহাম্মদপুর বলতে একটা অভিন্ন এলাকা বুঝলেও মোহাম্মদপুর আসলে তিনটা আলাদা এলাকার সমষ্টি। যেটা আদি মোহাম্মদপুর, অর্থাৎ যেখানে মোগল আমলের রাজা-বাদশাদের নামে সড়কের নাম, তা ধানমন্ডি আর গুলশানের মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে করে গড়ে তোলা হয়েছে ষাটের দশকে। আমরা এখন যে সন্ত্রাসের কথা বলি, আদি মোহাম্মদপুরে তার ছিটেফোঁটা নেই। তাজমহল রোড, নূরজাহান রোড বা সলিমুল্লাহ রোডের খাবারের দোকানগুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে আপনি ভুলে যাবেন কোথায় আছেন।
কিন্তু শিয়া মসজিদ পেরোনোর পর রিং রোড ডিঙিয়ে আপনি যখন নতুন গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকাগুলোয় প্রবেশ করবেন, তখন আপনি আসলে ভিন্ন এক শহরে ঢুকে পড়েছেন। এই এলাকা গড়ে উঠেছে গত ৩০ বছরে। আগে একটা সময় রিং রোডই ছিল মোহাম্মদপুরের শেষ সীমা। এরপর জলাভূমি। আমি নিজে এমনকি ১৯৯২ সালেও দেখেছি সাত গম্বুজ মসজিদের পেছনে খেয়াঘাট আর ধানক্ষেত। আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে এই এলাকায় মেসিং করে থাকি।
এই নতুন মোহাম্মদপুরের পুরো এলাকাটি ধেই ধেই করে বেড়েছে। একদিকে বেড়িবাঁধ পর্যন্ত, আরেকদিকে আদাবর-গাবতলী। এত দ্রুতগতিতে আবাসিক এলাকার সম্প্রসারণ শহরের আর কোথাও ঘটেনি। আর এর সবই হয়েছে বড় বড় আবাসন কোম্পানির অধীনে, আবাসিক প্রকল্প হিসেবে। এখনো তা চলছে।
মোহাম্মদপুরে আমার যেসব বন্ধুবান্ধব এখনো আছে, তাদের সঙ্গে আড্ডায় শুনেছি, বিশেষ করে বেড়িবাঁধের দিকে এখন যে আবাসিক প্রকল্পগুলো চলছে, অপরাধের মূল বীজ সেখানে নিহিত। ওটাই বীজতলা। আবাসিক প্রকল্প মানেই জমি কেনাবেচা আর হাতবদলের এক জটিল চক্কর, যার সঙ্গে এসে যুক্ত হয় ফড়িয়া-দালাল, স্থানীয় মাস্তান ও রাজনীতিবিদরা। পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে পেশি ফোলানোর ব্যাপার থাকে, ধমকানোর ঘটনা থাকে, জবরদস্তি থাকে। এরা তখন নিজ নিজ অনুগত বাহিনী তৈরি করে। আর সেটা করা হয় এলাকার অল্পবয়সী তরুণদের দিয়ে, যাদের পরিবার ছিন্নমূল হিসেবে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে বসতি গেড়েছে বেড়িবাঁধেরই দুই পাড়ে, কারণ পুরো শহরে এখানে আবাসন সহজ ও সস্তা। এই হলো মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের বাড়বাড়ন্তের পেছনের কারণ।
তার মানে আবাসন প্রকল্প আর তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি অনুকূল বাস্তুতন্ত্র— এই হলো মোহাম্মদপুরের ওয়াসিপুর বা সিটি অব গড হয়ে ওঠার পেছনের কাহিনি। ওয়াসিপুরে যেটা কয়লাখনি, রিও ডি জেনিরোতে যেটা মাদকচক্র, মোহাম্মদপুরে সেটা আবাসন প্রকল্প। এর সঙ্গে গত ৫ আগস্ট অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে পুলিশব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়া এবং থানা লুটের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র চলে যাওয়ার মতো নতুন কিছু ঘটনা পরিস্থিতি আরও সঙ্গিন করে তুলেছে। এলাকার মাস্তানির পুরনো চক্রের মুখবদলও অপরাধকে নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলেছে।
প্রত্যেক বড় শহরে একটি করে অপরাধপ্রবণ মহল্লা থাকে। নিউ ইয়র্কে যেমন সাউথ ব্রংক্স, লস অ্যাঞ্জেলেসে কম্পটন, শিকাগোতে সাউথ সাইড, তেমনি ইতালির নেপলসে ক্যামোরা এলাকা, রিও ডি জেনিরোতে ফাভেলা। ঢাকায় একটা সময় সেই দুর্নাম কুড়িয়েছিল মিরপুরের বেড়িবাঁধ এলাকা। এখন ব্যাটন হাতে তুলে নিয়েছে মোহাম্মদপুর। তার গা থেকে এই দুর্গন্ধ ঘোচাতে অনেক সময় লাগবে। কারণ, যে ইকোসিস্টেম এটার জন্ম দিয়েছে, তা অপসারণ কঠিন। শহরের বেড়ে ওঠার নাড়ির সঙ্গে এটার যোগ।




