জন্মদিনে বিশেষ লেখা
কী সুন্দর অন্ধ এবং একজন মহাদেব সাহা

মহাদেব সাহা (জন্ম: ৫ আগস্ট ১৯৪৪)। ছবি: নাসির আলী মামুন
মম পিতৃদেব মারফত পাওয়া কবিতার বইগুলোর একটা কবি মহাদেব সাহার ‘কী সুন্দর অন্ধ’। পিতৃদেবকে সম্ভবত উনার নির্মোহ আচরণে ত্যক্ত কোনো বান্ধবী উপহার দিয়েছিলেন। বইয়ের ইনারে উপহার দাত্রীর নাম ছিল না। উদ্ধৃত ছিল দুটি লাইন—
‘আমার অসুখ নেই আর; কাল সারা রাত থোকা
থোকা মৃত্যু পান করে আমি সুস্থ হয়ে গেছি’
তার নিচে একটা তিনটানের পাতা আঁকা।
বইটা আমি উদ্ধার করেছিলাম আমাদের কার (সিলিং বা চালার তলায় আরেকটা চালা) থেকে। কোঁচড়-ভরা মুড়ি, গুড় দিয়ে খেতে খেতে পড়েছিলাম কারে বসে বসেই। সেভেন-এইটে পড়ি মনে হয় তখন, প্রেমের সংখ্যা তিন। সবই আমার দিক থেকে, ফলে এগুলো সেই অর্থে প্রেম কি না, সে সন্দেহ আছে।
এই কবিতার বই, কী সুন্দর অন্ধ, ইঁচড়ে পাকা আমাকে ভালোবাসার জন্য প্রায় অন্ধ করে দিল। সব কবিতা যে বুঝেছি তাও না, তবুও ‘চিঠি দিও’ পড়ে কারও ‘চিঠি’ পাওয়ার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে উঠলাম। নিটোল, আবেগ পোষানো কবিতাগুলোয় মহাদেব সাহা আমাকে প্রেমিক করে তুলেছিলেন।
মহাদেব সাহাকে এখনো যখন কেউ তরল প্রেমের কবি বলেন, তখন আমার খুব রাগ লাগে। ‘চিঠি দিও’-এর মতো একটা কবিতা লেখা খুব কঠিন ব্যাপার বলেই আমার কাছে এখনো মনে হয়। স্বতঃস্ফূর্ত শিল্পের উদ্ভাসন কত কঠিন কবিমাত্রই তা জানেন।
‘কী সুন্দর অন্ধ’ পড়তে পড়তে, ‘স্মৃতি ছাড়া কোনো নোটবুক নাই’ পড়তে পড়তে আজও মহাদেব সাহাকে তাই, আমি ভালোবাসা পাঠাই। আসুন পড়া যাক চিঠি দিও—
করুণা করে হলেও চিঠি দিও,
খামে ভরে তুলে দিও আঙুলের মিহিন সেলাই
ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
এটুকু সামান্য দাবি
চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।
চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও, বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও
সমুদ্র বোঝাতে চাও, মেঘ চাও, ফুল, পাখি, সবুজ পাহাড়
বর্ণনা আলস্য লাগে
তোমার চোখর মতো চিহ্ন কিছু দিও!
আজো তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি
আসবেন অচেনা রাজার লোক, তার হাতে চিঠি দিও,
বাড়ি পৌঁছে দেবে।
এক কোণে শীতের শিশির দিও একফোঁটা, সেন্টের শিশির চেয়ে
তৃণমূল থেকে তোলা ঘ্রাণ, এমন ব্যস্ততা যদি—
শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো, তোমার কুশল!
ওই তো রাজার লোক যায়। ক্যাম্বিসের জুতো পায়ে, কাঁধে ব্যাগ,
হাতে কাগজের একগুচ্ছ সীজনড ফ্লাওয়ার।
কারো কৃষ্ণচূড়া, কারো উদাসীন উইলোর ঝোঁপ, কারো বা নিবিড় বকুল
এর কিছুই আমার নয়! আমি অকারণ হাওয়ায় চিৎকার তুলে বলি,
আমার কি কোনো কিছু নাই?
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, ভুলে গিয়ে ভুল করে
একখানি চিঠি দিও খামে
কিছুই লেখার নেই তবু লিখো
একটি পাখির শিস
একটি ফুলের ছোটো নাম,
টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে কিছু হয়তো পাওনি খুঁজে
সেইসব চুপচাপ কোনো দুপুরবেলার গল্প
খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড়ো একা লাগে, তাই লিখো
করুণা করেও হলে চিঠি দিও, মিথ্যা করে হলেও বলো, ভালোবাসি।
এই ব্যক্তিগত স্মৃতি আর কবিতার শরীর বেয়ে যখন মহাদেব সাহার কাব্যভুবনে প্রবেশ করেছিলাম, তখন শৈশবের এক অদ্ভুত সম্মোহনের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম কোনো সন্দেহ নেই। তিনি শুধু আমার একার নন, পাঁচ দশক ধরে অগণিত পাঠকের প্রেমিক হয়ে ওঠার প্রথম আশ্রয়দাতা কবি হয়ে ছিলেন। অথচ যারা সহজ চোখে দেখেন, তারা মাঝেমধ্যে বলে বসেন— তিনি ‘তরল প্রেমের কবি’। এই অভিযোগ শুনলে প্রতিবাদী কিশোরের মতোই একসময় আমার বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠত। কারণ মহাদেব সাহার কবিতার দিকে গভীর মনোযোগ দিলে বোঝা যায়, তার প্রেম মোটেই একরৈখিক বা তরল কোনো বাষ্পকথা কিংবা হাওয়ার তুবড়ি নয়; বরং তা মানুষের জটিল জীবনবোধ, নাগরিক হতাশা আর সামাজিক দ্রোহ থেকে উঠে আসা এক ঘন লিকারের চায়ের সাথে খাটি গব্যঘৃতের সংমিশ্রণের মতো সত্য।
মহাদেব সাহার কবিতায় প্রথমেই যে সুরটি কানে আসে, তা এক গাঢ় বিষাদ ও শূন্যতার। তিনি আধুনিক নাগরিক সভ্যতার যে নৈঃসঙ্গ্যের ছবি এঁকেছেন, তা তার মতো খুব কম কবিই পেরেছেন। একদিকে তিনি লেখেন: ‘বিষাদ ছুঁয়েছে আজ, মন ভালো নেই, মন ভালো নেই; / ফাঁকা রাস্তা, শূন্য বারান্দা / সারাদিন ডাকি সাড়া নেই’।
এই সারাদিন ডেকে সাড়া না পাওয়ার বেদনা আবার ধ্বনিত হয় আরেকটি নতুন কবিতায়, যেখানে কবি লিখছেন— ‘এই শূন্য ঘরে, এই নির্বাসনে / কতোকাল, আর কতোকাল! / আজ দুঃখ ছুঁয়েছে ঘরবাড়ি, / উদ্যানে উঠেছে ক্যাকটাস / কেউ নেই, কড়া নাড়ার মতো কেউ নেই / শুধু শূন্যতার এই দীর্ঘশ্বাস, এই দীর্ঘ পদধ্বনি’। এই পঙ্ক্তিগুলোয় যে ‘কড়া নাড়ার মতো কেউ নেই’-এর আর্তি, তা নিছক প্রেমিক-প্রেমিকার বিচ্ছেদ নয়, এ এক গোটা প্রজন্মের একাকিত্বের মহাকাব্যিক দলিল। অথচ এই হতাশার কিনারেই তিনি স্থাপন করেন মানবিকতার আলো, বেঁচে থাকার দুর্দমনীয় এক স্পৃহা।
তিনি লিখেছেন: ‘তবু মানুষ বেঁচে থাকতে চাই, আমি বেঁচে থাকতে চাই/ আমি ভালোবাসতে চাই, পাগলের মতো / ভালোবাসতে চাই— / এই কি আমার অপরাধ!’— এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মহাদেব সাহা প্রেমকে অধিকার নয়, অপরাধের মতো গভীর এক স্বীকারোক্তিতে পরিণত করেন। তার কাছে প্রেম, কাম, রতি, বিরহ বারবার ঘুরেফিরে এসেছে বটে, কিন্তু তা কখনো দেহসর্বস্ব বা সস্তা আবেগে পর্যবসিত হয়নি। বরং দেহের ঊর্ধ্বে উঠে তা মিলিয়ে গেছে এক বৃহত্তর মানবিক চেতনায়, কামহীন বাসনাহীন শ্বাশত প্রেমে।
মহাদেব সাহার প্রেমের রূপায়ণ যে কত বিচিত্র, তার প্রমাণ মেলে তার সেইসব পঙ্ক্তিতে যেখানে অপেক্ষা ও ব্যাকুলতা এক নিঃশ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য তৈরি করে। তিনি লেখেন: ‘একবার দেখা পাবো শুধু এই আশ্বাস পেলে/ এক পৃথিবীর এটুকু দূরত্ব/ আমি অবলীলাক্রমে পাড়ি দেবো/ তোমাকে দেখেছি কবে, সেই কবে, কোন বৃহস্পতিবার/ আর এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না।’ এই ‘এক কোটি বছরের’ অপেক্ষা একই সঙ্গে প্রেমের তীব্রতা ও সময়ের নিষ্ঠুরতাকে ধারণ করে।
‘এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না/ একবার তোমাকে দেখতে পাবো/ এই নিশ্চয়তাটুকু পেলে—/ বিদ্যাসাগরের মতো আমিও সাঁতরে পার হবো ভরা দামোদর…’— এই পঙ্ক্তিতে প্রেম এতটাই প্রবল যে, তা অসম্ভবকেও সম্ভব করার শপথে রূপ নেয়। কিন্তু এই অপেক্ষাই যখন বিষাদে রূপান্তরিত হয়, তখন কবি উচ্চারণ করেন: ‘তোমার শূন্য পথের দিকে তাকাতে তাকাতে/ দুই চোখ অন্ধ হয়ে গেলো/ সব নদীপথ বন্ধ হলো, তোমার সময় হলো না—/ আজ সারাদিন বিষাদপর্ব, সারাদিন তুষারপাত…/ মন ভালো নেই, মন ভালো নেই।’ এ যেন চিরকালীন এক অপেক্ষমাণ চোখের জল, যা বিন্দু বিন্দু হয়ে ঝরে পড়ে পাঠকের মনেও।
মহাদেব সাহার প্রেমের জগৎ শুধু বিরহ ও অপেক্ষাতেই থেমে থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে এক জটিল বন্ধনের নাম, যেখানে মুক্তি ও আসক্তি দ্বান্দ্বিকভাবে জড়িয়ে থাকে। ‘এভাবেই সম্পূর্ণ আড়ষ্ট হয়ে পড়ি; /তোমাকে ছাড়াতে গেলে আরো ক্রমশ জড়িয়ে যাই আমি/ আমার কিছুই আর করার থাকে না/ তুমি এভাবেই বেঁধে ফেলো যদি দূরে যেতে চাই/ যদি ডুবে যেতে চাই, তুমি দুহাতে জাগাও/ এমন সাধ্য কি আছে তোমার চোখের সামান্য আড়াল হই, দুই হাত দূরে যাই/ যেখানেই যেতে চাই, সেখানেই বিছিয়ে রেখেছো ডালপালা/ তোমাকে কি অতিক্রম করা কখনো সম্ভব!’— এই পঙ্ক্তিগুলো যেন প্রেমের এক পরিণত মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, যেখানে দূরে যাওয়ার চেষ্টা আরও গভীর জড়িয়ে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একই সুর ধ্বনিত হয় আরেকটি কবিতায়: ‘তোমাকে ভুলতে চেয়ে আরো বেশি ভালোবেসে ফেলি/ তোমাকে ছাড়াতে গিয়ে আরো বেশী গভীরে জড়াই/ যতই তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই দূরে, ততই তোমার হাতে বন্দী হয়ে পড়ি/ তোমাকে এড়াতে গেলে এভাবেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে যাই!!’ — এই যে ভুলতে গিয়ে আরও বেশি ভালোবেসে ফেলা, এড়াতে গিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়া, এ শুধু রোমান্টিকতার চূড়ান্ত প্রকাশ নয়, বরং মানুষের সম্পর্কের সেই গভীর সত্যকে উদ্ভাসিত করে, যা আমরা বুঝেও এড়াতে পারি না। এই সব চিত্রময়, গীতল ও আপাত-সহজ প্রকাশভঙ্গির কারণেই তার কবিতা হাজারো পাঠকের হৃদয়ে গাঁথা পড়ে আছে। পাণ্ডিত্যের কাঠখোট্টা অহংকার নয়, বরং জীবনের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাই তাকে মহান কবি করে তুলেছে।
শুধু প্রেমই তার কবিতার একমাত্র অনুষঙ্গ নয়। মহাদেব সাহা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিও একই রকম সচেতন ও দায়বদ্ধ। ‘এ কী বৈরী যুগে এসে দাঁড়ালাম আমরা সকলে’— এই পঙ্ক্তি দিয়ে তিনি যেমন সমকালীন রাজনৈতিক সংকটকে চিহ্নিত করেছেন, তেমনি অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার অবস্থান কবিতায় ঝলসে উঠেছে বারবার। তবে তার এই দ্রোহ কখনো স্লোগানে পরিণত হয়নি, বরং কবিতার শরীরে শিল্পগুণ অক্ষুণ্ণ রেখে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের দ্বারে। প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে শুরু করে ক্ষুধার্ত ‘হারু শেখের’ বাস্তবতা— সবকিছুই তার কলমে উঠে এসেছে এক অনিবার্য সত্যের মতো। ‘জুঁইফুলের চেয়ে শাদা ভাতই অধিক সুন্দর’— এই একটি উচ্চারণে তিনি যেমন রোমান্টিকতাকে ছাপিয়ে বাস্তবের ভূমিতে দাঁড়ান, তেমনি তার প্রেমিকসত্তা কখনোই ক্ষুধা ও শোষণের প্রশ্নে নীরব থাকেনি।
শেষ পর্যন্ত, মহাদেব সাহা তার কবিতার মাধ্যমেই নিজের জীবনী রচনা করে গেছেন। ‘আমার জীবনী আমি লিখে রেখে যাব/ মাটির অন্তরে, ধুলোর পাতায়/ লিখে রেখে যাবো মেঘের হৃদয়ে’— এই চিরন্তন সত্যের মতোই তিনি ছড়িয়ে আছেন আমাদের ভেতরেও। ১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট সিরাজগঞ্জের ধানঘড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি আজ ঢাকার উত্তরার আকাশের নিচে আমাদের মাঝেই আছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসা, দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন আর ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’ থেকে শুরু করে প্রকাশিত ৯৩টি গ্রন্থ— সবকিছুই যেন তার একনিষ্ঠ কাব্যসাধনার সোপান। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক থেকে শুরু করে ২০২১ সালে অর্জিত স্বাধীনতা পুরস্কার পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মানে তার কাব্যমুকুট শোভিত হয়েছে। কিন্তু এসব পুরস্কার তো তার জন্য নিছক অলংকার; প্রকৃত সিংহাসন সেই পাঠকের হৃদয়, যে তার কবিতা পড়ে আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরে এসেছে, যে ‘চিঠি দিও’ পড়ে এখনো কারও চিঠির অপেক্ষায় ব্যাকুল থাকে।
মহাদেব সাহার কবিতার গভীরে প্রবেশ করলে আমরা দেখতে পাই, প্রেম ও বিষাদের সীমা ছাড়িয়ে তার কলম এক অনিবার্য দেশপ্রেম ও মানবিকতার দলিল রচনা করেছে। যেখানে ব্যক্তির প্রেমিকসত্তা ক্রমশ মিলিয়ে যায় সমষ্টির চেতনায়, ব্যক্তির দেহ হয়ে ওঠে গোটা একটি দেশের মানচিত্র। ‘কফিনকাহিনী’ কবিতাটি যেন সেই শেষ কথা— যেখানে এক শবদেহ ঘিরে চার দেবদূত, আর সেই দেহ আর দেহ থাকে না, হয়ে ওঠে স্বদেশ, নদী, ফুল। এই কবিতাটি যেন তার সমস্ত কাব্যসাধনার এক অনিবার্য সমাপ্তি, যেখানে জীবন ও মৃত্যু, প্রেম ও দেশ, শরীর ও মাটি একাকার হয়ে যায়:
কফিনকাহিনী
মহাদেব সাহা
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বলল, দেখো ভিতরে রঙিন
রক্তমাখা জামা ছিল হয়ে গেছে ফুল
চোখ দুটি মেঘে মেঘে ব্যথিত বকুল!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে এক শবদেহ
একজন বলল, দেখো ভিতরে সন্দেহ
যেমন মানুষ ছিল মানুষটি নাই
মাটির মানচিত্র হয়ে ফুটে আছে তাই!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি শরীর
একজন বলল, দেখো ভিতরে কী স্থির
মৃত নয়, দেহ নয়, দেশ শুয়ে আছে
সমস্ত নদীর উৎস হৃদয়ের কাছে!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বলল, দেখো ভিতরে নবীন
হাতের আঙুলগুলি আরক্ত করবী
রক্তমাখা বুকজুড়ে স্বদেশের ছবি!
এই কফিনের ভেতরেই যেন শুয়ে আছে মহাদেব সাহার সমগ্র কাব্যদর্শন— যেখানে রক্তমাখা জামা ফুল হয়ে যায়, যেখানে মৃতদেহও হয়ে ওঠে মাটির মানচিত্র। এ এক মহাপ্রস্থানের কবিতা, অথচ বিষাদ নয়, বরং এক গূঢ় জাগরণের সুর এতে ধ্বনিত হয়। ‘মৃত নয়, দেহ নয়, দেশ শুয়ে আছে/ সমস্ত নদীর উৎস হৃদয়ের কাছে’— এই পঙ্ক্তি উচ্চারণ করেই যেন থেমে যেতে ইচ্ছে করে। কারণ এর চেয়ে গভীর, এর চেয়ে সত্য, এর চেয়ে সুন্দর করে কবিতায় দেশ ও প্রেমকে এক করা সম্ভব নয়। ‘স্মৃতি ছাড়া কোনো নোটবুক নাই’ পড়তে পড়তে, ‘কী সুন্দর অন্ধ’ পড়তে পড়তে যার হাতে একদিন প্রেমিক হয়েছিলাম, সেই কিশোর আজ এই কফিনকাহিনী পড়ে জানে— মহাদেব সাহা শুধু প্রেমিক নন, তিনি আমাদের মাটির, আমাদের নদীর, আমাদের স্বদেশের এক অমর কবি।










