মানুষ চেয়েছিল ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ সেটা হয়নি

মহিউদ্দিন আহমদ
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে তরুণ ও ছাত্রসমাজের যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা দেখতে দেখতে আজ দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে এসে পৌঁছেছে। বৈষম্যবিরোধী ব্যানারে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শুধু একটি নির্দিষ্ট দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা পরিণত হয়েছিল এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে, যা পতন ঘটিয়েছিল শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ দুই বছরে আন্দোলনের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হলো? আমরা কী পেলাম, কী পেলাম না, আর মানুষের মনের ক্ষোভ ও প্রত্যাশার জায়গাটিইবা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে?
২০১৮ সালে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে সব কোটা বাতিল করা হয়েছিল; কিন্তু পরে হাইকোর্টের রায়ের দোহাই দিয়ে আবার কোটাব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা একটি চরম নোংরা রাজনৈতিক খেলায় রূপ নেয়। যদিও কোটা ফিরিয়ে আনার রিট সরকার করেনি; কিন্তু রিটকারী আর রায়ে যে সরকারের সবুজসংকেত ছিল— সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আন্দোলনের সূত্রপাত এখান থেকেই; কিন্তু শেখ হাসিনা সরকার বরাবরই এ দেশের সাধারণ মানুষকে অবমূল্যায়ন করেছেন, ‘বোকা’ ভেবে এসেছেন। তারা ভেবেছিলেন রাষ্ট্রীয় শক্তি— পুলিশ, বিডিআর, সেনাবাহিনী এবং দলীয় লেজুড়বৃত্তি করা লাঠিয়াল বাহিনীকে মাঠে নামিয়ে যেকোনো উপায়ে আন্দোলন দমন করা যাবে। কিন্তু সরকার অনুধাবন করতে পারেনি, টানা অপশাসন, জনগণকে অবমূল্যায়ন করার কারণে মানুষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভের বারুদ কতটা বিস্ফোরক হয়ে উঠেছিল। আন্দোলনরত ছাত্রদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে যে উসকানিমূলক ব্লেম-গেম ও কুৎসিত ট্যাগিং করা হলো, তাতেই আগুন জ্বলে ওঠে। শত শত লাশের ওপর দাঁড়িয়ে তৎকালীন ক্ষমতার দম্ভ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন সর্বস্তরের মানুষ, রিকশাচালক থেকে গার্মেন্টস শ্রমিক, পেশাজীবী থেকে সাধারণ অভিভাবক— সবাই রাজপথে নেমে আসেন। দলহীন ও নির্দলীয় ব্যানারে তরুণদের এ আত্মত্যাগ পুরো জাতিকে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছিল।
হাসিনা সরকার মনে করেছিল, তার হাতে সব কার্ড আছে— প্রশাসন, অনুগত ব্যবসায়ী আর বিদেশি শক্তির সমর্থন। একই সঙ্গে, নানা পদপদবি, পুরস্কার ও সুবিধা দিয়ে তিনি একদল ‘দলদাস’ ও সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী তৈরি করেছিলেন। কিন্তু পতনের অন্তিম মুহূর্তে এই সুবিধাবাদীদের কাউকেই তার পাশে দেখা যায়নি। সুবিধাবাদীরা শুধুই মধুর খোঁজে আসে; বিপদের দিনে সরকারের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তগুলোকে উসকে দিয়ে তারা নিজেরা নিরাপদ দূরত্বে সরে গেছে। শেখ হাসিনাও দেশের আপামর মানুষকে বলির পাঁঠা বানিয়ে নিজ পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে নিজে দেশত্যাগ করেছেন।
আর অন্যদিকে দুই বছর আগের এই দিনে মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। দিনের ভোট রাতে কিংবা তথাকথিত ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন দিয়ে, নানা প্রসঙ্গে উটকো এবং তুচ্ছতাবাচক মন্তব্যে জনগণকে অবমূল্যায়ন করে মানুষকে বছরের পর বছর বোকা ভাবার ফলে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ; কিংবা অপমানবোধ তৈরি হয়েছিল সমাজে— এটি ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ।
অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আজকের চিত্রটি মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, প্রাপ্তির হিসাবটা বেশ মিশ্র ও সীমিত। ১. কোটা সংস্কার অর্জিত হয়েছে: যে তরুণসমাজ চাকরির কোটা সংস্কার চেয়েছিল, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তারা তাদের দাবিটি পেয়েছে। ২. রেজিম চেঞ্জ বা শাসন পরিবর্তন: রাজনৈতিক দলগুলো এবং শেখ হাসিনার অপশাসনে দীর্ঘদিন নির্যাতিত গোষ্ঠী তাদের বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা ক্ষমতার পরিবর্তন দেখতে পেয়েছে।
কিন্তু দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মূল আকাঙ্ক্ষা কি পূরণ হয়েছে? উত্তর হলো, সিংহভাগ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে— না। শ্রমজীবী মানুষ কিংবা সাধারণ নাগরিক শুধু এক ব্যক্তির পতন দেখতে চায়নি; তারা চেয়েছিল একটি বাসযোগ্য ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ। মানুষ চেয়েছিল: আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান ও স্থায়ী উন্নতি, সন্তান ও তরুণদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের সুব্যবস্থা, শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি সেবা খাতে নৈরাজ্য বন্ধ হওয়া এবং সর্বোপরি, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি হ্রাস পাওয়া।
বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষের এই মৌলিক প্রত্যাশাগুলোর ক্ষেত্রে কোনো হৃদয়গ্রাহী বা ইতিবাচক পরিবর্তন এখনো আসেনি। ফলে দিন দিন সাধারণ মানুষের হতাশা বাড়ছে।
আজকের সমাজে ও জনমত পরিচালনকারীদের মধ্যে নানা বিভেদ দৃশ্যমান। বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় বা সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আলোচনায় প্রায়ই ‘ডানপন্থী’ বা ‘বামপন্থী’ বিভাজনের কথা আনা হয়; কিন্তু আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, এই ‘ডান-বাম’ বিভাজনটি আসলে ধারণাগত বা শুধু রাজনৈতিক বাকচাতুরী (রেটোরিক); বাস্তবে এর কোনো প্রকৃত অস্তিত্ব নেই।
যারা সমাজে নিজেদের নিপীড়িত মনে করতেন, তারা ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর গণমাধ্যম ও নানা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পদপদবি দখল করছেন এবং নিজেদের সুবিধা গুছিয়ে নিচ্ছেন। এখানে নীতিগত ‘ডান’ বা ‘বাম’-এর কোনো লড়াই নেই; আসল লড়াইটা রয়ে গেছে যার যার সুযোগ-সুবিধা ও প্রত্যাশা পূরণের।
আজকের দিনে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা দেখলে মনে হয়, তারা যে ‘রেজিম চেঞ্জ’ চেয়েছিল, তা পেয়েই সন্তুষ্ট এবং তারা এখন ক্ষমতার নতুন খেলায় ব্যস্ত। একইভাবে একদল বুদ্ধিজীবী ও গোষ্ঠী এখন পদপদবি ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার দখলেই মনোযোগী। অর্থাৎ মুখের বদল হলেও ব্যবস্থার কোনো আমূল পরিবর্তন আসেনি।
সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা ইতিহাস থেকে কখনো কোনো শিক্ষা নেন না। ’৭৫, ’৯০, ১/১১ কিংবা সাম্প্রতিক চব্বিশের জুলাই— কোনো গণঅভ্যুত্থান বা ক্ষমতার রদবদল থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব শিক্ষা নেয়নি। আজও যখন ব্যর্থতা ঢাকতে কিংবা গণআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়ে অনেকে ‘ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব’ বা ‘বিদেশি চক্রান্তের’ অসংলগ্ন দোহাই দেন, তখন বুঝতে হবে— যারা পরাজিত হয় বা যারা ক্ষমতার মধু থেকে বঞ্চিত হয়, তারাই দিনশেষে এসব তত্ত্বের আশ্রয় নেয়।
জনগণকে অনন্তকাল বোকা বানিয়ে রাখা যায় না— চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান এই সত্যটি রক্তাক্ষরে প্রমাণ করেছে; কিন্তু আজ এক বছর পর এসে যদি নতুন সরকার বা রাজনীতি পরিচালনকারীরা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, যন্ত্রণা এবং মৌলিক চাহিদাগুলোকে পড়তে না পারেন, তবে এ হতাশা আবার নতুন কোনো অসন্তোষের জন্ম দেবে। শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, সাধারণ মানুষের জীবনের গুণগত পরিবর্তন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলেই জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।
লেখক: গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক




