বাধ্যতামূলক ‘বকশিশ’ ১৫০০ কোটি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কত কষ্টে নয়, কত টাকায় পৌঁছানো যাবে বাড়ি। সেই চিন্তা নূর হোসেনের। রাজধানীর মিরপুর থেকে কিশোরগঞ্জ। গ্রামের ঘরে পৌঁছাতে পথেই তার অন্তত ১০৫ টাকা ‘বকশিশ’ গুনতে হয়। ঈদের আনন্দযাত্রায় একইভাবে ফারুক আহাম্মেদের খসবে ৪৫ টাকা। একই দশা গণপরিবহন ব্যবহার করা প্রত্যেক মানুষের। বাধ্যতামূলক বকশিশের ভেতরেই সবাই। এ টাকার মোট অঙ্ক কত? প্রাতিষ্ঠানিক জবাব পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে আনুমানিক অঙ্কটা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।
ঈদের এ বকশিশ চলে অন্তত পাঁচ দিন। ঈদের দিন তো আছেই। আগে-পরে দুদিন করে আরও চার দিন। এ সময়টায় শুধু যে ঢাকা থেকে গ্রামে যেতে দিতে হয়, তা নয়। গ্রামেও বাড়ি থেকে বাজারে যেতে বকশিশের নামে বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়।
যাত্রীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির একটি হিসাব আছে। এতে বলা হচ্ছে, সারা দেশে অন্তত পাঁচ কোটি মানুষ দিনে বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহনে চলাচল করে। তাদের প্রত্যেকে যদি অন্তত চারটি করে ট্রিপ (এক ট্রিপ সমান একবার একটি গাড়িতে চড়া) দেয় তাহলেও দিনে অন্তত ২০ কোটি ট্রিপ হয়। পাঁচ দিনে ট্রিপ সংখ্যা দাঁড়াবে ১০০ কোটিতে। গড়ে যদি ১৫ টাকা বকশিশ দিতে হয়, সেক্ষেত্রে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা গণপরিবহনে বকশিশ যাবে। এমন একটি ধারণা দেন বিআরটিএ’র কর্মকর্তারাও।
নূর হোসেনের হিসাবের ছবিটা অনেকটা এরকম— বাসা থেকে নেমে রিকশায় প্রথমে জিয়া কলোনি। ২৫ টাকার ভাড়া দিতে হবে অন্তত ৪০ টাকা। সেখান থেকে বাসে বিমানবন্দর। ১০ টাকার ভাড়া হবে ২০। এরপর কিশোরগঞ্জের বাসে ৩৫০ টাকার ভাড়া গুনতে হবে অন্তত ৪০০। বাস থেকে নেমে অটোরিকশায় (সিএনজি) যেতে হবে করিমগঞ্জ। সেখানেও ৩০ টাকার ভাড়া দিতে হবে ৫০। এরপর রিকশায় আবার ২০ টাকার ভাড়া দিতে হবে ৩০। প্রতি বাহনে নূর হোসেন গড়ে বকশিশ দেবেন ২১ টাকা।
ফারুক আহাম্মেদ থাকেন ঢাকার কলাবাগানে। গাজীপুরের নিজ বাড়িতে যাবেন। তাকেও বকশিশ দিতে দিতেই যেতে হবে পথের প্রতিটি গাড়িতে। বাসা থেকে নেমে ফারুক কিছুটা হেঁটে ৩২ নম্বরের মোড় থেকে ভিআইপি বাসে যাবেন জয়দেবপুর। ১০০ টাকার নিয়মিত ভাড়া বকশিশ যুক্ত করে হবে ১১০। সেখান থেকে ২৫ টাকায় রিকশায় চড়ে যাবেন ভাওয়াল রাজবাড়ী। এখানেও বকশিশ যুক্ত হবে ১০ টাকা। জয়দেবপুর থেকে রাজবাড়ী পর্যন্ত পাঁচজন একসঙ্গে নিয়ে অটোরিকশা ছেড়ে যায়। ভাড়া জনপ্রতি ১০০। এটি মাথাপিছু ২৫ টাকা বেড়ে যাবে। চরসিন্দুর একতা মোড়ে শেষ হবে বকশিশের যাত্রা। বাকিটা তো তার হাঁটা পথ। এ যাত্রায় ফারুকও বাধ্যতামূলক ৪৫ টাকা বকশিশ দেবেন। তবে পুরো পথে গড়ে প্রতি গাড়িতে বকশিশ দেবেন ১৫ টাকা।
এর একটি উল্টো দিকও আছে। যারা যাত্রীদের পার করে দিচ্ছেন স্বজনের সঙ্গে উৎসব করতে— তাদের কোনো উৎসব ভাতা নেই। নিয়োগপত্রই নেই! ভাতা হবে কীভাবে? তারা অবহেলিত। ন্যূনতম মজুরি নেই। নানান সময় আন্দোলন করেও আদায় করতে পারেননি এসব দাবি।
সমাজবিজ্ঞানীদের ভাবনায়, উৎসবের সময় সমাজের প্রান্তিক মানুষরা কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেতে চায়। সামর্থ্যবানরা তখন বেশি খরচ করেন। এটাও আনন্দ ভাগাভাগি করার একটা ধরন। বিষয়টি জোরাজুরি করার চোখে না দেখে চাওয়া-পাওয়ার দৃষ্টিতে দেখলে কঠিন মনে হবে না।
এ কথার সঙ্গে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামছুল হক একমত প্রকাশ করেছেন। একটা ভিন্নতাও দেখছেন তিনি, ‘এখানে রাষ্ট্রের দায় আছে। নিয়মের দুর্বলতার কারণে অপ্রচলিত এ বিষয়টি প্রচলিত হয়ে যাচ্ছে। বকশিশ স্বেচ্ছায় খুশি হয়ে দেওয়ার জিনিস, বাধ্য হয়ে দেওয়ার নয়। বাধ্য হয়ে বকশিশ দেওয়া অনেক সময় অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়।’
আসলে পরিবহনব্যবস্থা আইন দিয়ে বেঁধে রাখা যাচ্ছে না। পরিবহন শ্রমিকরা আনুষ্ঠানিকভাবে বোনাস পান না। তাই তারা বকশিশটা জোর দিয়ে আদায় করেন। যদি তারা শ্রমিক হিসেবে বোনাস পেতেন, তাহলে বাধ্যতামূলক বকশিশের প্রথা দুর্বল হতো বলেও মনে করছেন শামছুল হক।
শ্রম ও পরিবহন আইনে পরিবহন শ্রমিকদের জন্য কয়েকটি গ্রেডে বেতন পরিশোধের বিধান রয়েছে। সেখানে বলা আছে একজন পরিবহন শ্রমিকের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের কথা। বেশি হলে দিতে হবে ওভারটাইম। কিন্তু আইনে থাকলেও বাস্তবে পরিবহন শ্রমিকরা চাকরির জন্য কোনো নিয়োগপত্র পান না। ফলে তাদের মাস শেষে থাকে না কোনো নির্দিষ্ট বেতন। তাই উৎসব ভাতাও থাকে না। তাদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ হয় দৈনিক মজুরি বা ট্রিপভিত্তিক চুক্তিতে। তাই যাত্রীর কাছ থেকে নেওয়া বকশিশের টাকাই তাদের উৎসব ভাতায় রূপ নেয়।
পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাস, হিউম্যান হলার (লেগুনা), টেম্পো, অটোরিকশার মতো যানগুলোর চালকরা দৈনিক ইজারা ভিত্তিতে নিয়ে থাকেন। এতে মালিকদের চালককে বেতন দেওয়ার সুযোগ থাকে না। দিন শেষে মালিকই চুক্তির টাকা পেতে শ্রমিকের পেছনে ঘোরেন। গ্রেড অনুযায়ী, একজন চালকের মাসিক বেতন হওয়ার কথা ২০ হাজার ৮০০ টাকা। কিন্তু শ্রমিক ও চালকরা বেতন পান ট্রিপ অনুযায়ী। নিয়ন্ত্রণকারী বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বিষয়টি দেখার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির চোখ যেন অন্ধ।
পরিবহন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ হানিফ খোকন মনে করেন, ‘শ্রমিকরা যদি মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতন পেত তাহলে তাদের একটা দায় তৈরি হতো। আসলে তাদের চাকরিটাও চাকরি না। অনেকটা মজুরগিরি করা। তাই লজ্জা ভুলে বাধ্য হয়েই বকশিশের জন্য হাত পাততে হয়।’
গত বছর ঈদুল ফিতরে যাত্রী কল্যাণ সমিতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, ঈদযাত্রায় ১২ দিনে বিভিন্ন পরিবহনে প্রায় ৮৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা বকশিশের নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহনে ২২ কোটি ৭৪ লাখ ৯০ হাজার ট্রিপে মানুষের যাতায়াত করে। এসব ট্রিপে যাত্রীদের থেকে এ ভাড়া আদায় হচ্ছে। দেশের ৯৮ শতাংশ যানেই এ সময় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে থাকে।
সমিতির হিসাবে, নৌপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ৮০ কোটি, রাজধানীতে চলাচলকারী অটোরিকশায় ৬০ কোটি, বিভিন্ন ধরনের রিকশায় ১৬০ কোটি এবং প্রাইভেট কার, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২১ কোটি, সদরঘাটে বিভিন্ন পারাপারে ১০০ কোটি, হিউম্যান হলারে ১৬ কোটি, বাস-মিনিবাসে ৯০ কোটি, ঢাকায় চলাচলকারী বাসে ১২ কোটি, ট্রেনের ছাদে ৮০ লাখ, রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে ২৫০ কোটি, রেলে টিকিটবিহীন যাত্রী থেকে ৭ কোটি ৫০ লাখ এবং বিমানে ৩৫ কোটি টাকা আদায় করার একটা ধারণা দেওয়া হয়।






