রুয়েটডিসির মূল ভিত্তি গ্রুমিং

বিতর্কের অনুশীলন শেষে একসঙ্গে রুয়েটের বিতর্ক ক্লাব রুয়েটডিসির সদস্যরা
রুয়েটের বিতর্ক ক্লাব ‘রুয়েটডিসি’। জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য, প্রতিযোগিতার আয়োজন ও সদস্যদের জন্য বিভিন্ন সেশন তাদের অনন্য করেছে। গল্পটি লিখেছেন তৌফিক আহমেদ
‘১৯৯২ সালের ৮ মে মাত্র ১০ থেকে ১২ জন সদস্যকে নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এখন রুয়েট ডিবেটিং ক্লাবে (রুয়েটডিসি) ১০০ জনের বেশি সদস্য সক্রিয়। যুক্তিবোধ, নেতৃত্ব এবং মুক্তচিন্তার চর্চার মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করছি ক্লাব যেন রুয়েটের অন্যতম প্রাণবন্ত সংগঠনে পরিণত হয়।’ কথাগুলো রুয়েটডিসির সভাপতি তানভির হাসানের। তাদের তিন দশকের বেশি সময়ের পথচলায় জড়িয়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি, সংগ্রাম ও আত্মবিশ্বাস তৈরির গল্প। তানভির জানান, এখানে অনেকের মতো তারও শুরুটা ছিল ভীতি আর কৌতূহলের মিশেলে। স্কুল-কলেজে বিতর্কচর্চার সীমিত অভিজ্ঞতা থাকায় প্রথম দিকে মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়ানোর আগে মঞ্চভীতি কাজ করত। একদিন সিনিয়র ভাই বলেছিলেন, বিতর্কের মূল কথাই হলো তথ্য জানা আর আত্মবিশ্বাসী থাকা। সেদিনের পর থেকে আস্তে আস্তে তার ভয় রূপ নেয় আত্মবিশ্বাসে। সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি মনে করেন রুয়েট শহীদ মিনারের সামনের সবুজ ঘাসে বসে ক্লাবের অনানুষ্ঠানিক সভা, সিনিয়র ভাই-আপুদের সঙ্গে প্রাণখোলা আড্ডার মুহূর্তগুলো। এখন অবশ্য আধুনিক সভাকক্ষে কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
রুয়েটডিসির সভাপতি তাদের এই যাত্রায় স্মরণীয় মুহূর্তের কথা বলেন এভাবে, ‘আমরা দীর্ঘদিন কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল বা ফাইনালে উঠেও ট্রফি জিততে পারছিলাম না। একসময় রুয়েটডিসি সেমি-কুফা নামেও প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের জুনে এই অপেক্ষার অবসান ঘটে। আমরা বহুল প্রতীক্ষিত ‘টিআইবি-ডিইউডিএস আর্থ অ্যান্ড ক্লাইমেট ডিবেট’ ট্রফিটি ঘরে নিয়ে আসি। ক্লাবের একজন সদস্য হিসেবে এই অর্জনের অংশ হতে পারা আমার জন্য গর্বের। ওই একটি ট্রফিই আমাদের ক্লাবের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এনে দেয়। এর পরের দেড় বছরে রুয়েটডিসি আরও সাত-আটটি ট্রফি নিজেদের করে নেয়। এই সাফল্যের মধ্যে আছে ২০২৫-এর ইউল্যাব ভক্স ৩.০, বিআরইউডিএফ আইভি ২.০ চ্যাম্পিয়নশিপ, দশম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্মারক আন্তঃক্লাব বিতর্ক উৎসবে রানার্সআপ ট্রফি। রুয়েটডিসির টিম ‘রুয়েটডিসি সক্রেটিস’ আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটিং ডিবেট ফেস্ট ৩.০-এ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
রুয়েটডিসি ‘আওয়ার ডিবেট, আওয়ার ড্রিম’ স্লোগানে শুরু থেকেই ক্যাম্পাসে যুক্তিনির্ভর চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি ও বিশ্লেষণধর্মী সংস্কৃতি গড়ে তুলছে। জাতীয়, আন্তর্জাতিক, সমসাময়িক ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে নিয়মিত বাংলা ও ইংরেজি বিতর্ক, কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, পাবলিক স্পিকিং সেশন, আন্তঃবিভাগ প্রতিযোগিতা, নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি এবং সামাজিক-নীতিনির্ধারণী বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শনী বিতর্ক আয়োজন করছে।
প্রতি বছর ক্লাব ফ্রেশার্স ডিবেট টুর্নামেন্ট, আন্তঃবিভাগ বিতর্ক, ডিবেট প্রিমিয়ার লিগ এবং জাতীয় পর্যায়ে ‘রুয়েটডিসি জাতীয় বিতর্ক উৎসব’ আয়োজন করে। এই উৎসবে দেশ জুড়ে প্রায় ২৫০ জন বিতার্কিক অংশ নেন। ২০২৫ সালের উৎসবে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজের ৬৪টি দল অংশগ্রহণ করে। ফলে রুয়েট ক্যাম্পাস দেশের বিতর্কচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি আয়োজনেই অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও ক্লাবের স্পন্সরশিপ নিয়ে আসার টিম ‘রুয়েটডিসি চাণক্য’ সব সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করে কাজ করে যাচ্ছে। কার্যনির্বাহী পর্ষদের নিয়মিত আয়োজনের বাইরে বারবিকিউ, শর্ট ট্যুর, অান্তঃক্লাব বিতর্ক, পাবলিক স্পিকিং ও কেস কম্পিটিশনের মতো বাড়তি আয়োজন করেন তারা।
ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তানজিমুল ইসলাম জানালেন, তাদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সদস্যদের অদম্য জয়ের মানসিকতা। প্রতি সপ্তাহে সাপ্তাহিক অনুশীলন সেশন, পাঠচক্র, সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক আলোচনা এবং নিয়মিত কর্মশালা হয়। ফলে সদস্যদের যুক্তি, গবেষণা ও উপস্থাপনা দক্ষতা ধারাবাহিকভাবে উন্নত হয়। নবীনদের জন্য ফ্রেশার্স ডিবেট টুর্নামেন্ট ও ওয়ার্কশপ আয়োজন করে শুরু থেকেই শক্ত ভিত তৈরি করা হয়। আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের বাইরে তারা অবসরে বিতর্ক অনুশীলন ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের আরও শাণিত করেন। তার মতে, মেধাবী সদস্যদের পরিশ্রম, শক্তিশালী টিমওয়ার্ক এবং ধারাবাহিক গ্রুমিংই রুয়েটডিসির সাফল্যের মূল ভিত্তি।




