৩ হাজার থেকে ৪ লাখ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রচুর বই, ম্যাগাজিন ও গবেষণাপত্র রয়েছে
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে আছে চার লাখের বেশি বই। এখানে চলে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখা। তাদের এই ভুবন নিয়ে লিখেছেন ত্রিশানুর রহমান। ছবি তুলেছেন বিশাল আহমেদ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে মাত্র মাস্টার্স পাস করেছেন ২০১৯-২০ সেশনের ছাত্র শাহজালাল শাহীন। অনার্স ও মাস্টার্সে পেয়েছেন প্রথম শ্রেণি। তার এই ঈর্ষণীয় ফলাফলের পেছনে আছে বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে নিয়মিত পড়ালেখা। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই সেন্ট্রাল লাইব্রেরির প্রতি আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন পত্রিকা, ম্যাগাজিন বা গল্প-উপন্যাস পড়ার পাশাপাশি অ্যাকাডেমিক পড়ালেখাও করেছি এখানে। এ লাইব্রেরি আমার সফলতার সূতিকাগার। এখন গ্রন্থাগারে বসেই চলছে আমার এমফিল কোর্সে ভর্তির প্রস্তুতি।
এই গ্রন্থাগারে প্রতিদিন পড়াশোনা করেন এমন হাজারো শিক্ষার্থী। সদ্য স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর, এমফিল, পিএইচডির গবেষক, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও আছেন এ তালিকায়। কেউ পড়ছেন সাহিত্য; কেউ ইতিহাস, দর্শন, ভূগোল, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন বা সাময়িকী ও দৈনিক পত্রিকা। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার পাশাপাশি এখানে চলে উচ্চতর গবেষণা ও বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আব্দুল করিম ভবনে কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ আছে। এর দক্ষিণে ছোট্ট একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবন। বইয়ের সংখ্যার দিক থেকে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগারগুলোর একটি। দোতলাবিশিষ্ট গ্রন্থাগার ভবনের দ্বিতীয় তলায় বিজ্ঞান পাঠকক্ষ, ব্যবসায় প্রশাসন, সমাজবিজ্ঞান ও আইন পাঠকক্ষ এবং নিচতলায় কলা ও মানববিদ্যা পাঠকক্ষের সঙ্গে রয়েছে ব্যক্তিগত বই পড়ার স্থান এবং সাময়িকী ও পত্রিকা পড়ার স্থান।
১৯৬৬ সালের নভেম্বরে মাত্র তিন হাজার বই নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এই গ্রন্থাগারে বই রয়েছে চার লাখের বেশি। দেশি-বিদেশি বই ও জার্নাল ছাড়াও রয়েছে অনেক পুরনো ও দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রহ। গ্রন্থাগারের দুষ্প্রাপ্য শাখায় এমন কিছু সংগ্রহ রয়েছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোনো গ্রন্থাগারে পাওয়া যায় না। এখানে হাতে তৈরি তুলট কাগজ ও তালপাতার ওপর বাংলা, সংস্কৃত, পালি, উর্দু, আরবি ও ফার্সি ভাষায় লেখা পাঁচ শতাধিক পাণ্ডুলিপি রয়েছে। রয়েছে ১৮৭২ থেকে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত প্রায় সাড়ে তিন হাজার পুরনো সাময়িকী।
হাতে তৈরি তুলট কাগজ ও তালপাতার ওপর বাংলা, সংস্কৃত, পালি, উর্দু, আরবি ও ফার্সি ভাষায় লেখা পাঁচ শতাধিক পাণ্ডুলিপি রয়েছে
সুবিশাল এই বইয়ের স্বর্গের মাঝেই চলে শিক্ষার্থীদের পাঠ্য ও পাঠ্যের বাইরের মুক্ত জ্ঞানচর্চা। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের কাছ থেকে নেওয়া জ্ঞান শাণিত হয় গ্রন্থাগারে। শিক্ষক-প্রদত্ত জ্ঞানের বাইরেও চলে নানা ধরনের পড়াশোনা। দোতলা এই ভবনের ভেতরে শত পরিশ্রমের গল্প রয়েছে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল লাভের আশায় কঠোর সাধনার গল্প রয়েছে, স্বপ্নপূরণ কিংবা নিরাপদ ভবিষ্যতের তাড়নায় ভালো একটি চাকরির প্রত্যাশায় দিন-রাত অধ্যবসায়ের গল্পও আছে।
প্রতিনিয়ত হাজারো জ্ঞানপিপাসুর তৃষ্ণা মিটিয়ে চলেছে এই গ্রন্থাগার। এ প্রসঙ্গে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ছাত্র আরাফাত আহমেদ আজাদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি আমাদের কাছে এমন সমুদ্র, যেখান থেকে আমরা জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটাচ্ছি। জ্ঞানচর্চার যে বিশাল প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলাম, তা পূরণ করতে পারছি এই লাইব্রেরিতে বসে।
এই গ্রন্থাগার নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ঝুলিও ছোট নয়। গ্রন্থাগারে পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই বলেও অভিযোগ করেন অনেক শিক্ষার্থী। বাংলার ২০২২-২৩ সেশনের ছাত্র শিবলী নোমান বলেন, গ্রন্থাগারে পর্যাপ্ত রেফারেন্স বই নেই। অনেক সময় অ্যাকাডেমিক পড়া তৈরি করার জন্যও প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বই পাওয়া যায় না। নৃবিজ্ঞানের ২০২২-২৩ সেশনের ছাত্র আরিফুল ইসলাম বলেন, লাইব্রেরি ভবনের ভেতরে পর্যাপ্ত ফ্যান নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোও পুরনো, প্রায় নষ্ট। ফলে গরমের জন্য পড়ায় বেশ অসুবিধা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত বই পড়ার স্থানে আসন সংখ্যা কম। আরও বাড়ানো দরকার।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক ড. মো. আলমগীর বলেন, ব্যক্তিগত বই পড়ার স্থান বাড়ানোর জন্য আমাদের লাইব্রেরি ভবনের সংস্কার চলছে। নতুন কিছু ফ্যান ও চেয়ার-টেবিল সংযোজন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী রেফারেন্স বই ও চাকরি প্রস্তুতির বইয়ের সংগ্রহ বাড়ানোর কাজ তো চলছেই।




