কম খরচের আদ্-দ্বীনে আস্থা রাখতে চান রোগীরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘড়িতে সময় তখন বেলা ১১টা। ভবনটিতে পা রাখতেই চোখে পড়ল সবার কর্মব্যস্ততা। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার নিয়ে টানা কাজ করে চলেছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। কোথাও মিস্ত্রি ঠুকঠুক শব্দ তুলে হাতুড়ি পেটাচ্ছেন, কোথাও চলছে ধোয়া-মোছার কাজ। এরই মধ্যে রোগীরা কেউ লাইন ধরে টিকিট কাটছেন, কেউ বা নির্ধারিত চিকিৎসকের কক্ষে ছুটছেন, কেউ আবার ডাক্তার দেখানো শেষ করে বের হয়ে যাচ্ছেন।
এই চিত্র রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণের। ৪৫ দিন বন্ধ থাকার পর আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টায় ফের খুলেছে হাসপাতালটি। শুরু হয়েছে বহির্বিভাগ, অন্তঃবিভাগ, জরুরি বিভাগসহ সব ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম।
৪৫ বছরের এক নারী রোগী এসেছেন নরসিংদীর রায়পুর থানার চরমধুয়া ইউনিয়ন থেকে। তিনি স্তন সংক্রমণ এবং থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন। হাসপাতাল বন্ধের আগে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছিলেন। এরপর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রিপোর্ট সংগ্রহ করতে পারেননি। আজ সকালে রিপোর্ট সংগ্রহ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
এই নারী বললেন, ‘আমরা গরিব ফ্যামিলি। হাসপাতাল বন্ধ থাকায় অসুবিধায় পড়েছিলাম। অন্য কোথাও এত কম টাকায় চিকিৎসা পাওয়া যায় না।’
তাই গত সোমবার রাতে ছেলের কাছে হাসপাতাল চালুর খবর শুনে গতকাল ভোরে উঠেই রওনা দিয়েছেন। তার বাড়ি থেকে নরসিংদী শহরে আসতেই দুই ঘণ্টা লাগে। এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছেন কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা নিতে।
কথা হলো ২৫ বছর বয়সী এক অন্তঃসত্ত্বার সঙ্গে। নিয়মিত চেকআপ করাতে সকাল সকালই চলে এসেছেন তিনি। আট মাসের এই অন্তঃসত্ত্বার গর্ভকালীন বেশ কিছু জটিলতা আছে। এ পর্যন্ত তিনি ৯ বার চেকআপ করিয়েছেন। এরপর আদ্-দ্বীন হাসপাতাল দেড় মাস বন্ধ থাকায় এ সময়টুকু চিকিৎসা নেননি। অপেক্ষায় ছিলেন হাসপাতাল খোলার।
এই নারী বলছিলেন, ‘হাসপাতাল খোলায় খুব খুশি হয়েছি। রাতে সংবাদ দেখে সকালে হাসপাতালে কল দিয়ে নিশ্চিত হয়ে চলে এসেছি।’ তিনি জানালেন, স্বাভাবিক বা সিজার যাই হোক, তিনি এই হাসপাতালেই ডেলিভারি করাবেন। এখানকার চিকিৎসকদের সেবা ও ব্যবহারে সন্তুষ্ট তিনি।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের প্রশাসন ব্যবস্থাপক মোছা. হোসনে আরা জানালেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী বন্ধের সময়ে অনেক সংস্কারকাজ হয়েছে। রোগীবান্ধব করতে এখনো কিছু কাজ চলছে।
তিনি বললেন, ‘আজ সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বহির্বিভাগে ৬০৭ জন রোগী সেবা নিয়েছেন। রোগীদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা এবং শিশুই বেশি। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৬ রোগী। এ সময় আট অন্তঃসত্ত্বা সি-সেকশনে এবং তিন নারী স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব করেছেন।’
হাসপাতাল চালু হওয়ায় কর্মীদের মধ্যেও ছিল উচ্ছ্বাস। প্রতিষ্ঠানটিতে জনবলের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। নারীকর্মী মনোয়ারা বেগম বলছিলেন, ‘চাকরি নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। এই মধ্যবয়সে নতুন করে চাকরি জোটানো কঠিন ব্যাপার।’
বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসক ইলিয়াস মানসুরের ভাষ্য, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। এখন উৎকণ্ঠা কেটে গেছে।’
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক জামালুন্নেসা জানালেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন, আলো-বাতাস চলাচলসহ অক্সিজেনের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। ডাক্তার, নার্স ও কর্মীদের অধিকতর দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে সংস্কার বেশি
হাসপাতালটির পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে কোরবানির ঈদের আগের দিন, গত ২৭ মে একে একে নিভে যায় ছয় নবজাতকের প্রাণ। নবজাতকদের মৃত্যুতে কর্তৃপক্ষের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ায় গত ১১ জুন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রয়োজনমতো সংস্কারের পর গত ২৭ জুলাই আবার লাইসেন্স ফেরত পেয়েছে হাসপাতালটি।
আজ সকালে পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে গিয়ে দেখা গেল, চলছে শেষ পর্যায়ের কাজ, যেন ডেলিভারির পরই মা ও শিশুকে এনে রাখা যায়। পোস্ট-অপারেটিভের নন-পেয়িং কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র নেই। মাথার ওপরে ফ্যান ঘুরছে। এই কক্ষে নতুন করে প্রশস্ত জানালার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেন সার্বক্ষণিক বাতাস চলাচল করতে পারে। আর পোস্ট-অপারেটিভের পেয়িং কক্ষে এসির ব্যবস্থা থাকলেও জানালার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কক্ষটি করা হয়েছে সুসজ্জিত।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন। সঙ্গে সাড়ে ৩ বছরের মেয়ে। তিনি বললেন, ‘বড় সন্তানের এখানে জন্ম হয়েছে, ছোটটির জন্মও এখানে হবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় ভয় পাচ্ছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘দুর্ঘটনা যেকোনো জায়গাতেই হতে পারে। সেসব নিয়ে ভাবি না। তবে হাসপাতালকে রোগীদের ক্ষেত্রে আরও যত্নশীল হতে হবে।’
আরেক অন্তঃসত্ত্বাও একই প্রশ্নের জবাবে হাসপাতালটির ওপর আস্থা রাখার কথা বললেন। তিনি বলছিলেন, ‘এখানে রোগী হিসেবে সম্মান পাওয়া যায়, বাসা অনেক দূরে, তবু আস্থা রেখে আসছি।’ ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তিনি কিছুটা চিন্তিত, তবে খরচের কথা ভেবে এখানেই আস্থা রাখার কথা জানালেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘কোনো হাসপাতালে কোনো কিছু সংঘটিত হলে হাসপাতাল বন্ধ করা সমাধান নয়। এটি কোনো ব্যক্তির খেয়ালখুশিমতো হতে পারে না। আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনা জরুরি, ব্যবস্থাপনায় সংস্কার দরকার।’







