শিক্ষাজীবনের জটিলতায় ৬৪৬ আদ্-দ্বীন শিক্ষার্থী
- হাসপাতাল বন্ধ থাকায় ইন্টার্নশিপ চলছে না
- সবচেয়ে চাপে বিদেশি শিক্ষার্থীরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আইন অনুযায়ী বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সঙ্গে আছে হাসপাতাল থাকার বাধ্যবাধকতা। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের ঘটনায় শুধু রোগীসেবাই নয়, উদ্বেগে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও। শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে সবচেয়ে বেশি জটিলতায় পড়েছেন কলেজের বিদেশি শিক্ষার্থীরা।
গত ২৭ মে, কোরবানির ঈদের আগের দিন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে মারা যায় ছয় শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তে উঠে এসেছে কর্তৃপক্ষের গাফিলতির প্রমাণ। দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকায় অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে মারা গেছে এই নবজাতকরা। এরপর ১১ জুন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে সরকার।
এ ঘটনায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে একই ফাউন্ডেশন পরিচালিত আদ-দ্বীন উইমেনস মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। কলেজের লাইসেন্স বাতিল না হলেও হাসপাতাল বন্ধ থাকায় ইন্টার্নশিপ চলছে না শিক্ষার্থীদের। ইন্টার্ন চিকিৎসক রয়েছেন ৮৪ জন। ২০০৮ সালে চালু হওয়া এই মেডিকেল কলেজে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী ৬৪৬।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, অনেক খোঁজখবর নিয়ে তারা এখানে ভর্তি হয়েছিলেন। কারও পড়াশোনা শেষের দিকে। অনেকে ইন্টার্ন করছেন। তারা নিজেদের মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ পেতেন। যেখানে কাজ করতেন নিজেদের শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে, যা এখন বন্ধ। এই অবস্থায় হাসপাতাল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে হুমকির মুখে পড়বে তাদের পড়াশোনা। অন্য হাসপাতালে খাপ খাওয়াতে অসুবিধা হবে তাদের। সেখানে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগও সীমিত হয়ে যেতে পারে।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের কী হবে
হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের ঘটনায় সবচেয়ে চাপে বিদেশি শিক্ষার্থীরা। এই মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০৯। তারা সবাই ভারতীয় বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
নাম না প্রকাশের শর্তে এক ভারতীয় শিক্ষার্থী বলছেন, ‘এক হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস করে অন্য হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ হলে বিষয়টা আমাদের দেশের নীতিমালা অনুমোদন করবে না। ফলে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত বাংলাদেশে পড়ে এখন দেশে ফিরে গিয়েও নতুনভাবে পড়াশোনা শুরু করা অসম্ভব।’
পড়াশোনা শেষ করে এই শিক্ষার্থী নিজের দেশে ফিরে কাজ করতে চান। আরেক শিক্ষার্থী বলছেন, ‘এই দেশে (বাংলাদেশে) পড়তে আসার সময় যে হাসপাতালে এমবিবিএস করব, সেখান থেকেই ইন্টার্নশিপ করার শর্তে পড়তে এসেছি। আশা করি, এ দেশের সরকার আমাদের ক্যারিয়ারের ঝুঁকি বুঝে বিষয়টা বিবেচনা করবে।’
ভারতের ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশনের বিদেশি মেডিকেল স্নাতকদের লাইসেন্স ও নিবন্ধন নীতিমালা ২০২১ অনুযায়ী, প্রত্যেক বিদেশি মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটকে অবশ্যই একই প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ১২ মাসের ইন্টার্নশিপ করতে হবে। বিধিমালা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ কোর্স ও ইন্টার্নশিপ একই প্রতিষ্ঠানে অবিচ্ছিন্নভাবে শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা আছে। অন্য হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করলে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেটি গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা না-ও করতে পারে।
আবার বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন ২০২২ অনুযায়ী, বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ন্যূনতম ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকার শর্ত আছে। যেখানে শিক্ষার্থীর হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ থাকবে। এমবিবিএস পাস করার পরে শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপ করবে।
যদিও গত সোমবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হলেও আদ-দ্বীন উইমেনস মেডিকেল কলেজ বন্ধ করা হয়নি। কলেজের শিক্ষার্থীরা অন্য হাসপাতালে প্র্যাকটিস করতে পারবে। তাদের আরও হাসপাতাল আছে, সেখানে নিতে পারে। অমানবিক সেবার কারণে আমরা কঠিন সিদ্ধান্ত (লাইসেন্স বন্ধ) নিয়েছি।’
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক রুবীনা ইয়াসমীন আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চলবে জানতে কলেজ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এর জবাব এখনো আসেনি। জবাব পেলে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
প্রশ্ন করা হয়েছিল আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুলকে। তার ভাষ্য, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আমরা ইতোমধ্যে চিঠি দিয়েছি। মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে বিস্তারিতভাবে আরও চিঠি লিখব।’ সরকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে— এমন প্রত্যাশা তার। একই সঙ্গে হাসপাতালের অসঙ্গতি দূর করতে সংস্কারকাজ চলছে বলেও জানান।






