হামে দিনে গড়ে আক্রান্ত ১০৫৬ আরও ৭ মৃত্যু

সংগৃহীত ছবি
প্রতিরোধযোগ্য রোগ হাম। অথচ সেই রোগটিতেই দেশে দৈনিক গড়ে মৃত্যু হচ্ছে সাতজনের। আর দিনে গড়ে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৫৬ জন। আক্রান্ত ও মৃতের অধিকাংশই শিশু। গত মার্চ থেকে আক্রান্তের হার একইরকম। তবে মৃত্যুহার কিছুটা কমেছে আগের তুলনায়।
গত ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন করে তথ্য রাখছে হামে আক্রান্ত ও মৃতের। তাদের তথ্য বিশ্লেষণ করেই দৈনিক এই গড়চিত্র পাওয়া গেল। কয়েকজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা বলছেন, হামে এখনো জরুরি পরিস্থিতি চলছে। টিকার লক্ষ্যমাত্রা কম থাকায় তৈরি হয়নি হার্ড ইমিউনিটি। ফলে থামছে না আক্রান্ত ও মৃত্যু। জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ভৌগোলিক কারণে ঢাকা, সিলেটে মৃত্যু বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩১ জন। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৭৩৮ জন। এ সময় আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৫০ জন। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বললেন, ‘টিকা ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পরও হামের পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ার কারণে শুধু মৃত্যুহার কিছুটা কমেছে।’
তৈরি হয়নি হার্ড ইমিউনিটি : এ ধরনের রোগের ক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীর ৯৫ শতাংশের বেশি টিকার কাভারেজের আওতায় এলে চার সপ্তাহের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়ে যায়। তখন কমতে থাকে সংক্রমণ। কিন্তু দেশে হামের টিকার ক্যাম্পেইন শেষ হয়েছে প্রায় সাত সপ্তাহ। এরপরও দেখা যাচ্ছে, মৃত্যু কিছুটা কমলেও হামে আক্রান্তের হার প্রায় একই রকম আছে।
জরুরি পরিস্থিতির কারণে হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে শুরুতে ঘাটতি ছিল। ঠিকমতো হিসাব করা সম্ভব হয়নি। তাতে হামের নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। সেই বাস্তবতা অস্বীকার না করে টিকার লক্ষ্যমাত্রা সমন্বয় করার ওপর জোর দিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক মো. হালিমুর রশীদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘সরকারের তরফ থেকে যা করার সুযোগ ছিল, সবই করেছে। এখন অপেক্ষা করছি। দেখি (হামের পরিস্থিতি) কী হয়।’
টিকার এই ফাঁকফোকর নতুনভাবে আলোচনায় আসে সাম্প্রতিক ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের সময়। দেশে হাম প্রাদুর্ভাবের সময় যে বয়সী শিশুরা টিকা পেয়েছে, সেই একই বয়সীদের খাওয়ানো হয়েছে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল। অথচ এ দুই কর্মসূচির মধ্যে শিশু সংখ্যায় ব্যবধান ৩৮ লাখের বেশি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, ‘সরকার টিকার লক্ষ্যমাত্রা কম রেখেছিল। সে কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও হামে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ শিশু টিকার আওতায় আসেনি। এই সত্য সরকারকে মানতে হবে। সেটি মেনে বাদ পড়া মানুষকে খুঁজে খুঁজে হামের টিকা দিতে হবে। নতুবা এর সংক্রমণ থামবে না।’
বেশি মৃত্যু ঢাকা ও সিলেটে : গত ২৪ ঘণ্টার মৃত সাত রোগীর মধ্যে চারজন ঢাকায় ও একজন সিলেটে মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময় হামে মৃত্যু বেশি হচ্ছে এ দুই বিভাগে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, দেশের বস্তি এলাকা এবং ‘হার্ড টু রিচ এরিয়া’ বা দুর্গম এলাকায় কোনো সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়। জনস্বাস্থ্যবিদ মোহাম্মদ ইকবাল বললেন, ‘দুর্গম এলাকাতে স্বাভাবিকভাবেই সংক্রমণ ব্যবস্থাপনা কঠিন।
দ্রুত এসব এলাকা চিহ্নিত করে টিকা দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের সদিচ্ছাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা) ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার অবশ্য বলছেন, ঢাকা ও সিলেট দুই জায়গাতেই অনেক শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। এটা হামে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। পাশাপাশি হামের লক্ষণ নিয়ে যেসব শিশু মারা যাচ্ছে, তা আসলেই হাম কি না গবেষণা করে দেখা দরকার— যোগ করলেন তিনি।




