দেশের অর্ধেক হাসপাতাল আগুন ঝুঁকিতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রোগ নিরাময়ের শেষ আশ্রয়স্থল হাসপাতাল। যেখানে মানুষ আসে জীবন বাঁচাতে। অথচ সেই হাসপাতালেই তাড়া করে ফিরছে আগুনের আতঙ্ক। জীবন প্রদীপের বদলে সেখানে জ্বলছে যেকোনো মুহূর্তে ছাই হয়ে যাওয়ার শঙ্কা। সরকারি সমীক্ষাতেই উঠে এসেছে আশঙ্কা জাগানিয়া এমন এক চিত্র। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, দেশের প্রায় অর্ধেক হাসপাতালই এখন যেন একেকটি আগুনের বারুদ। সবচেয়ে শঙ্কা হলো, শুধুই অখ্যাত ক্লিনিক নয়; এই তালিকায় রয়েছে সাধারণ মানুষের ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী, হৃদরোগ, নিউরোসায়েন্সেস ও শিশু হাসপাতালের মতো দেশের নামকরা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোও। যাকে দেশের পুরো চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরই এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানী ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ২০২০ সালে এসি বিস্ফোরণ থেকে লাগা আগুনে প্রাণ যায় পাঁচ করোনা রোগীর। সম্প্রতি আগুন লাগে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। ১৫ জন রোগীকে দ্রুত সরানো গেলেও বাঁচানো যায়নি একজনকে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে আগুন লেগে ছাই হয়ে যায় বিছানা ও দামি যন্ত্রপাতি। দিনের বেলা হওয়ায় অনেকটাই অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় শিশুরা। এভাবে প্রায়ই আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে হাসপাতাল-ক্লিনিকে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, গত ছয় বছরে দেশের হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ঘটেছে ৮৬২টি অগ্নিদুর্ঘটনা। গড়ে প্রতি বছর ঘটছে ১৪৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।
এসব দুর্ঘটনায় হতাহতের পাশাপাশি পুড়ে গেছে হাসপাতালের অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও ওষুধ, যাতে একদিকে যেমন রোগীর সেবা ব্যাহত হয়েছে, অন্যদিকে হাসপাতালগুলোর বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়।
হাসপাতালে জীবন বাঁচাতে এসে আগুনে পুড়ে মৃত্যুর ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী জানালেন, দেশের হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোতে রয়েছে গুরুতর সমস্যা। ‘হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো সাধারণ ভবনের মতো। ভবন তৈরির সময় রোগী, আগুন বা গ্যাসের দুর্ঘটনার কথা মাথায় রেখে ভবন নির্মাণ করা হয় না। ফলে হাসপাতালে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। আবার দুর্ঘটনা হলে ক্ষয়ক্ষতিও বেশি হয়।’
২০২০ সাল থেকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেল, গত ছয় বছরে হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বছরে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে গড়ে ১৪৪টি। ২০২০ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৯০টি। এরপর থেকে ২০২৪ সাল ছাড়া ফি বছরই বাড়ছে দুর্ঘটনার সংখ্যা। ২০২৫ সালের অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৩৪টি, বেসরকারি হাসপাতালে ২৫টি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৭২টি ঘটনা ঘটে।
হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত ত্রুটির কথা স্বীকার করলেন খোদ প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালের অবকাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনি কাঠামো অপ্রতুল। এ কারণে একটা লিগ্যাল টিম গঠন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে হাসপাতালগুলোর অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি নিরূপণসহ মান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, সরকারি হাসপাতালগুলো নিয়মিত তদারকির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
ঝুঁকিতে ৪৮ শতাংশ হাসপাতাল-ক্লিনিক: অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি নিরূপণে প্রতি বছর বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভবন পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ১ হাজার ৫৩টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস। এর মধ্যে ৫০৮টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে আগুনের ঝুঁকিতে। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে ৭৬টি প্রতিষ্ঠান। মাটির নিচে জলাধারের ধারণক্ষমতা, প্রবেশদ্বারের প্রশস্ততা, জরুরি নির্গমন সিঁড়ি, স্মোক ডিটেক্টর, মেঝের আয়তন, লিফটসহ নানা সূচকে নিরূপণ করা হয় এই ঝুঁকি।
পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি ঝুঁকিপূর্ণ হাসপাতালের নামের তালিকা। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ তালিকায় রয়েছে বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকের পাশাপাশি দেশের নামকরা ও বড় হাসপাতালগুলোও। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসনকেন্দ্র, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালগুলোর ভবন সাধারণ ভবনের মতো। রোগী, আগুন বা গ্যাসের সুরক্ষার কথা ভেবে এগুলো তৈরি করা হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের নোটিস ও জরিমানায়ও কাটেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, প্রতি বছর ভবন পরিদর্শন করে তারা আগুনের ঝুঁকি নিরূপণ করে হাসপাতালগুলোকে তা জানায়। সতর্ক করে বারবার দেওয়া হয় চিঠি। বলা হয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। তবে হাসপাতালগুলো পরিস্থিতি পাল্টাতে খুব একটা তৎপর নয়। যদিও এসব হাসপাতালের কর্তারা বলছেন, ঝুঁকি জেনেও বিকল্প অবকাঠামো না থাকায় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
ঢামেক হাসপাতালে এ পর্যন্ত অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে বহুবার। এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছেন রোগীও। ঢামেকের ১২২ বছরের পুরাতন ভবনে নেই জরুরি নির্গমন অবস্থা, বৈদ্যুতিক লাইনের সক্ষমতার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারও বড় ঝুঁকির কারণ। এ ভবনে অগ্নিদুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে বলে শঙ্কা ফায়ার সার্ভিসের।
ভবনটির দুরবস্থার কথা স্বীকারও করলেন ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে এই ভবন চলছে। ঝুঁকি মাথায় রেখে চলতি বছরে হাসপাতাল চত্বরে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে মহড়া এবং প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে। এর পাশাপাশি নতুন ভবন তৈরি করে ধীরে ধীরে পুরাতন ভবন থেকে কার্যক্রম কমিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত রয়েছে। সাবস্টেশন তৈরি করে ভবনের বৈদ্যুতিক চাপও কমিয়ে ফেলা হবে।’
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে ২০২৪ সালে আগুন লেগে পুড়ে যায় শয্যাসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। এই হাসপাতালটিও রয়েছে অগ্নিদুর্ঘটনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। সম্প্রতি এ হাসপাতালে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত আছেন বলে জানালেন পরিচালক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম। তার ভাষ্য, ‘ঝুঁকি জেনেও এই ভবনে চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকরাও কাজ করছেন। আগুন যাতে না লাগে, সেজন্য আমরা সচেতন আছি, তবে ভবন পরিত্যাগ করার মতো অবকাঠামো সুবিধা এ হাসপাতালের নেই।’
যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকির মুখে থাকা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল করা উচিত। সুরক্ষা নিশ্চিত করলেই শুধু লাইসেন্স ফেরত দেওয়া দরকার। রোগীদের জীবন নিয়ে এই খেলা আর চলতে পারে না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলছেন, ‘অধিদপ্তর থেকে হাসপাতালগুলো প্রতি বছর পরিদর্শন শেষে কর্তৃপক্ষকে ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করা হয়। নিয়মিত নোটিস পাঠানো হয়, জরিমানা করা হয়। এরপরও হাসপাতালগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
একই ধরনের মত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনের। তিনি বললেন, ‘ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর নিয়মিত হাসপাতাল পরিদর্শন করে, এটি ভালো উদ্যোগ। পাশাপাশি আগুনের ঝুঁকি বেশি থাকলে ওই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা উচিত। ঝুঁকি নিরসন করতে পারলে তারা আবার লাইসেন্স ফেরত পাবে। নতুবা রোগীর পাশাপাশি হাসপাতালের জনবলও ঝুঁকিতে থাকবেন, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’




