খুলনার ডেঙ্গু ছাড়াতে পারে ঢাকাকেও
- মোট আক্রান্ত ৯৯৮৯ সেপ্টেম্বরেই ৪৪২০ জন
- মোট মৃত্যু ৩৫, সেপ্টেম্বরে ১৭
- দেশে মোট আক্রান্ত ৫৮৪০০
- মোট মৃত্যু ১৭৬
- ঢাকার চেয়ে বেশি এডিস মশার লার্ভা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের শুরু থেকেই ঢাকা ছিল ‘হটস্পট’। এমনকি ১৯৬৪ সালে প্রথম যখন দেশে অজ্ঞাত রোগের বেশে ‘ডেঙ্গু জ্বরের’ সংক্রমণ ঘটে, তখন এর নাম দেওয়া হয়েছিল ঢাকা ফিভার। তবে এবার মৌসুমের শুরুতেই খুলনার যে পরিস্থিতি, তাতে ভয়াবহতার দিক দিয়ে ঢাকাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। খুলনায় মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। মোট ভর্তি রোগীর ৪৪ শতাংশই হাসপাতালে এসেছে চলতি মাসের প্রথম ১৭ দিনে। মোট মৃত্যুর অর্ধেকও ঘটেছে এই সময়ে। আর সে কারণেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের শঙ্কার তালিকায় ঢাকার ওপরে উঠে আসছে খুলনা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছর এই অঞ্চলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৯ হাজার ৯৮৯ ব্যক্তি। মারা গেছে ৩৫ জন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৭ দিনেই খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪ হাজার ৪২০, মারা গেছে ১৭ জন।
যাদের একজন ৪০ বছরের মো. রেজোয়ান। ফুলতলা উপজেলার এই বাসিন্দা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। প্রতিদিনই তার রক্তের প্লেটলেট কমছিল। চিকিৎসাধীন গত ১০ সেপ্টেম্বর মারা যান তিনি।
খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণ বিভাগের অন্য এলাকার চেয়ে অনেক বেশি। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত ৩৫ জনের ২০ জনই মারা গেছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আর বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু নিয়ে ২৪১ ব্যক্তি হাসপাতালে এসেছেন। এর মধ্যে ১৮৮ জন সরকারি হাসপাতালে এবং ৫৩ জন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মারা গেছেন একজন।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলছিলেন, ব্রুটো ইনডেক্সের (বিআই) মাধ্যমে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি হিসাব করা হয়। ঢাকায় এডিস মশার প্রজননস্থলে লার্ভার ঘনত্ব সর্বনিম্ন বিআই ২০ এবং সর্বোচ্চ ৪০, যা উদ্বেগজনক। কিন্তু এ বছর খুলনা ও বাগেরহাটে এডিস মশার বিআই ঢাকার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে। এমনকি ঢাকার চেয়েও খারাপ হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজন বললেন, সেপ্টেম্বরের মাত্র ১৭ দিনের পরিসংখ্যানই বলছে খুলনায় ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি বৃদ্ধির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। হাসপাতালগুলোয়
রোগীর চাপ এবং মৃত্যুর ধারাবাহিকতা পরিস্থিতিকে জনস্বাস্থ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সেপ্টেম্বরের বাকি দিনগুলোয় পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার যে পূর্বাভাস দিলেন, সে অনুযায়ী বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এই মাসের শেষের দিকে এবং অক্টোবরের প্রথম দিকে খুলনার ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে।
এবারের ডেঙ্গু রোগীদের বেশিরভাগই খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকার, জানালেন খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক শেখ মো. মোশাররফ হোসেন। তিনি বলছিলেন, হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ বেড়েছে। রোগীর চাহিদার কারণে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটেরও সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি খারাপ হলে তাঁবু বসিয়ে অস্থায়ী স্বাস্থ্য ক্যাম্প তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
কয়েক বছর ধরেই খুলনা শহরের নগরায়ণ হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে। ড্রেনেজ এবং সুয়ারেজ ব্যবস্থাপনাও ত্রুটিপূর্ণ। ড্রেনের চেয়ে বাড়িঘর নিচু। বৃষ্টি হলেই পানি ঘরবাড়িতে ঢুকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। সেই পানি কোথায় জমছে এবং কত দিন থাকছে, তা আমলে নিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সিটি করপোরেশন। আবার খুলনার তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাত এডিসের জন্য অনুকূল। খুলনা জেলা বিভাগের সবচেয়ে বড় হটস্পট।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান জানালেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে খুলনা শহরের ৩১টি ওয়ার্ডকে লাল, কমলা, হলুদ তিনটি জোনে ভাগ করে কাজ চলছে। প্রত্যেক ওয়ার্ডে কীটনাশক ছিটানোর জন্য জনবল কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করতেও চলছে প্রচার।
আড়াই মাস ধরে মশক নিয়ন্ত্রণে নানা ধরনের কর্মসূচি চলছে জানিয়ে সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বললেন, ‘তবুও ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছি না। সামনের তিন মাস আরও গুরুত্ব দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ জোরদারভাবে চলবে।’
তবে নির্দিষ্ট কিছু সময় নয়, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে সমান গুরুত্ব দিয়ে সারা বছর কাজ করতে হবে বলে মত বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনের। এতে জনগণকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি অন্তত পাঁচ বছর টানা কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার পরামর্শ তার।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও বলছিলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমাতে সেকেন্ডারি পর্যায়ের হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। এডিসের
প্রজননস্থল ধ্বংস এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে লক্ষ্যভিত্তিক মশকনিধন কার্যক্রমে ভালো ফলাফল আসবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মশাবাহিত এ রোগে মারা গেছেন ১৭৬ জন, এর মধ্যে নারী ৯২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৫ জন, হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪৮৪ জন। আর চলতি বছর মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫৮ হাজার ৪০০ জন। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যূ বেশি ঢাকায়।



