প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ইসলামি নীতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার এমন এক ভৌগোলিক বাস্তবতায় অবস্থিত, যেখানে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, অভিন্ন নদী, পরিবেশ ও সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে রয়েছে বিস্তৃত সমুদ্র। ফলে এখানে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের নীতির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের নৈতিক ও নীতিগত নির্দেশনাগুলোও প্রাসঙ্গিক।
পবিত্র কোরআন রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের জন্য যে নৈতিক ভিত্তি নির্ধারণ করেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ন্যায়বিচার। ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৮) আয়াতটির ব্যাখ্যায় ইমাম তাবারি ন্যায়বিচারকে বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে সমগুরুত্ব তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক মতবিরোধ, স্বার্থের সংঘাত কিংবা অতীতের বিরোধ থাকলেও তার ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করা ইসলামের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিজের অধিকার যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি অন্যের অধিকারও স্বীকার করতে হবে।
ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো অঙ্গীকার ও চুক্তির প্রতি বিশ্বস্ততা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ১) অন্য আয়াতে এসেছে, ‘অঙ্গীকার পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে হুদায়বিয়ার সন্ধি রক্ষা একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত। ৬ হিজরিতে সম্পাদিত এ সন্ধির কিছু শর্ত সাহাবিদের কাছে কঠিন মনে হলেও নবীজি (সা.) চুক্তি মেনে চলেছেন। (বুখারি, হাদিস: ২৭৩১-২৭৩২) ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এ ঘটনাকে নবীজির প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও দূরদর্শিতার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এর শিক্ষা হলো, তাৎক্ষণিক আবেগের পরিবর্তে চুক্তির মর্যাদা এবং বৃহত্তর শান্তির স্বার্থ বিবেচনা করা জরুরি।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলামের নীতি অন্ধ বন্ধুত্ব কিংবা স্থায়ী বৈরিতার কোনো দর্শন নয়
প্রতিবেশী রাষ্ট্র অমুসলিম হলেই তার সঙ্গে বৈরিতা করতে হবে, ইসলামের শিক্ষা এমন নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা ধর্মের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না।’ (সুরা মুমতাহিনা, আয়াত: ৮) ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় শান্তিপ্রিয় অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচারের বৈধতার কথা উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী আয়াতে যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নিপীড়ন ও উচ্ছেদে অংশ নিয়েছে, তাদের ব্যাপারে ভিন্ন অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সম্পর্ক নির্ধারণে শুধু ধর্মীয় পরিচয় নয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষের আচরণ ও অবস্থানও বিবেচ্য।
মদিনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যে লিখিত চুক্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ইসলামের ইতিহাসে মদিনার সনদ নামে পরিচিত। ইবন হিশাম তার ‘আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ’তে এ চুক্তির বিভিন্ন ধারা সংরক্ষণ করেছেন। এতে মদিনার বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক দায়িত্ব, নিরাপত্তা ও সম্মিলিত প্রতিরক্ষার বিষয় পাওয়া যায়। আধুনিক সংবিধান বা রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে মদিনার সনদকে হুবহু এক করে দেখা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ নয়; তবে বহু গোষ্ঠী ও বহু ধর্মীয় সমাজে চুক্তিভিত্তিক সহাবস্থান ও পারস্পরিক দায়িত্ব নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দৃষ্টান্ত হিসেবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
প্রতিবেশীর অধিকার ইসলামে এত গুরুত্বপূর্ণ যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।’ (সহিহ বুখারি, ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, ৪৭) হাদিসটি ব্যক্তি-প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে হলেও এর নৈতিক শিক্ষা বৃহত্তর পরিসরেও তাৎপর্যপূর্ণ: নৈকট্য যেন সংঘাতের কারণ না হয়ে দায়িত্ব ও নিরাপত্তার সম্পর্ক তৈরি করে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয় কোরআনের নির্দেশ, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা একে অপরকে সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা আল-মায়িদা, ৫:২)
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলামের নীতি অন্ধ বন্ধুত্ব কিংবা স্থায়ী বৈরিতার কোনো দর্শন নয়। এর ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার, অঙ্গীকার রক্ষা, শান্তির প্রতি আগ্রহ, আগ্রাসন থেকে বিরত থাকা, বৈধ আত্মরক্ষা, পারস্পরিক নিরাপত্তা এবং কল্যাণকর সহযোগিতা। কোরআন-সুন্নাহ ও নবীজি (সা.)-এর রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের আলোকে যে নীতিটি স্পষ্ট হয় তা হলো, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ অবশ্যই বিবেচিত হবে, কিন্তু সেই স্বার্থ বাস্তবায়নের পথ ন্যায় ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করবে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্কের ইসলামি দর্শনের মূলকথা তাই হলো নিজের অধিকার রক্ষা করে অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এবং বিরোধের মধ্যেও ন্যায় ও শান্তির পথ খোলা রাখা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



