মাদ্রাসার দরজায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয় না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সাভারের মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসার শিশুটির বয়স সাত। পরিবারের অভিযোগ, এই আবাসিক মাদ্রাসায় তাকে প্রায় ছয় মাস ধরে একাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক যৌন নির্যাতন করেছেন। প্রথম আলো ৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রকাশ করে। শিশুটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাদ্রাসাটিতে ভর্তি হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নির্যাতনের শিকার হতে শুরু করে। যে শিক্ষকের কাছে সে নিরাপত্তা চেয়েছিল, তার বিরুদ্ধেও পরে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। আরও কয়েকজন শিক্ষকের কাছে ঘটনা বলার পর তাকে মারধর ও ভয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। শিশুটির বাবা ১৫ আগস্ট মাদ্রাসার মুহতামিমের কাছে বিষয়টি জানান। তার অভিযোগ, তখন তাকে থানায় না যেতে এবং বিষয়টি বাইরে না বলতে বলা হয়। পরদিন তাকে জানানো হয়, অভিযুক্তদের জুতাপেটা করে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, এর বেশি কিছু করার দরকার নেই।
শিশুটির বাবা ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার আবেদন করেন। বিচারক আবেদনটি আমলে নিয়ে সাভার মডেল থানাকে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে নিতে নির্দেশ দেন। মামলায় মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়। ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সমস্যাটা শুধু একজন শিক্ষক বা কয়েকজন শিক্ষার্থীর অপরাধের অভিযোগে আটকে থাকে না। এখানে প্রশ্নটা সরাসরি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের অনুপস্থিতির। একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানের নিজের সুনাম রক্ষার স্বার্থ থাকতে পারে। কিন্তু সেই স্বার্থ কখনো শিশুর নিরাপত্তার ওপর যেতে পারে না।
টাঙ্গাইল শহরের এনায়েতপুর এলাকার হযরত ফাতেমা (রা.) মহিলা মাদ্রাসায় ১০ বছরের এক আবাসিক ছাত্রীর গোপন ভিডিও ধারণ এবং ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে শিক্ষক ওবায়দুল্লাহর বিরুদ্ধে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও যুগান্তর ৬ আগস্ট ২০২৫ ঘটনাটি প্রকাশ করে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে টাকা চুরির অপবাদ দেওয়া হয়, পরে নগ্ন অবস্থায় ভিডিও ধারণ করতে বাধ্য করা হয় এবং সেই ভিডিও ব্যবহার করে ভয় দেখানো হয়। এই কেসে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। অভিযুক্ত শিক্ষক ওবায়দুল্লাহ ছিলেন মাদ্রাসার পরিচালক মোহাম্মদুল্লাহর ছোট ভাই। পরিবারের অভিযোগ, বিষয়টি পরিচালককে জানানোর পর তিনি অভিযুক্ত ভাইকে সেখান থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ দেন। পরে পুলিশ শিক্ষক ও পরিচালক দুজনকেই গ্রেপ্তার করে। ভুক্তভোগীর মা টাঙ্গাইল সদর থানায় মামলা করেন।
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের কাঠামোটা খেয়াল করা দরকার। অভিযুক্ত শিক্ষক পরিচালকের আপন ভাই। অভিযোগ করার জায়গাটিও সেই পরিচালকের কাছে। এ ধরনের কাঠামোয় ১০ বছরের একটি শিশুর জন্য ‘অভিযোগ করার সুযোগ আছে’ বলা কাগজে ঠিক হতে পারে, বাস্তবে নয়।
কয়েকটি ঘটনা দিয়ে সব মাদ্রাসা বা সব শিক্ষক সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত টানা যায় না। কিন্তু এই তিনটি ঘটনায় একটা মিল আছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশ্ন এসেছে প্রতিষ্ঠান নিজে অভিযোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম কি না এবং প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলে শিশুর কাছে রাষ্ট্রে পৌঁছানোর স্বাধীন পথ আছে কি না
ফরিদপুর শহরের দক্ষিণ গোয়ালচামট এলাকার রওজাতুন-নেছা মহিলা মাদ্রাসার এক আবাসিক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় পরিচালক আশরাফ আলীকে ২৫ জুন ২০২৬, ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এ ঘটনাটি ঘটেছিল ২৩ এপ্রিল ২০২৫। মেয়েটি ওই মাদ্রাসার আবাসিক হিফজ শিক্ষার্থী ছিল। মামলার তথ্য অনুযায়ী, পরিচালক তাকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। মেয়েটি সেখান থেকে বেরিয়ে পরিবারকে ঘটনা জানায়। পরিবার প্রথমে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করে। সেটি ব্যর্থ হওয়ায় ৯ মে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করে।
‘স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা’ কথাটা খুব সহজে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো নয়। শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ যদি প্রথমে সালিশ, প্রতিষ্ঠান, আত্মীয় বা স্থানীয় প্রভাবশালীর টেবিলে যায়, তাহলে একটি ফৌজদারি অভিযোগকে সামাজিক বিরোধের মতো দেখা শুরু হয়। তখন আইনের কাছে যাওয়ার আগে পরিবারকে আরেকটি ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর দিয়ে যেতে হয়। যার সামাজিক শক্তি কম, তার জন্য সেই পথ আরও কঠিন।
কয়েকটি ঘটনা দিয়ে সব মাদ্রাসা বা সব শিক্ষক সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত টানা যায় না। কিন্তু এই তিনটি ঘটনায় একটা মিল আছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশ্ন এসেছে প্রতিষ্ঠান নিজে অভিযোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম কি না এবং প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলে শিশুর কাছে রাষ্ট্রে পৌঁছানোর স্বাধীন পথ আছে কি না।
ডয়চে ভেলে ১১ আগস্ট ২০২৬ ‘মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন: তথ্য-পরিসংখ্যান এবং ভিন্নমত’ শিরোনামে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলো আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক হিসাব রাখে না। ফলে মাদ্রাসায় কতটি ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, তার আলাদা বছরভিত্তিক বা মাসভিত্তিক নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। এখানেই রাষ্ট্রের একটা মৌলিক সমস্যা ধরা পড়ে। ঘটনা বাড়ছে কি না, সেটা নিয়ে দুই পক্ষ তর্ক করতে পারে। কিন্তু এ ধরনের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সরকারি তথ্যও যদি প্রকাশ্যে না থাকে, তাহলে কোন পক্ষের দাবি ঠিক, তা যাচাই করার উপায় কী?
বাংলাদেশের মাদ্রাসাব্যবস্থার রাজনৈতিক কাঠামোর আলোচনা করা জরুরি। আলিয়া মাদ্রাসা বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আওতায়। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান নিজেই ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, কওমি মাদ্রাসা তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। অন্যদিকে, রাষ্ট্র ২০১৮ সালে আইন করে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস সনদকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবিতে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান দিয়েছে। এখানে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন আছে। রাষ্ট্র একটি শিক্ষাব্যবস্থার সনদকে আইনি স্বীকৃতি দিতে পারে, কিন্তু সেখানে আবাসিক শিশু কীভাবে থাকবে, অভিযোগ কোথায় করবে, শিক্ষক নিয়োগের আগে কী যাচাই হবে, যৌন নির্যাতনের অভিযোগ কে তদন্ত করবে— এসব প্রশ্নে রাষ্ট্রের উপস্থিতি যদি অস্পষ্ট থাকে, তাহলে স্বীকৃতি আর জবাবদিহির মধ্যে একটা ফাঁক তৈরি হয়। এটা ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়। একটি শিশুর শরীর কারও ধর্মীয় বা প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের অংশ নয়।
এই পটভূমিতে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মূল্যবোধ আন্দোলনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ছয়শ আলেমের বিবৃতিটিও দেখা দরকার। বিবৃতিতে সাভারের ঘটনার নিন্দা করা হয়েছে। তদন্ত এবং শাস্তির দাবি করা হয়েছে। কিন্তু একই বিবৃতিতে মাদ্রাসার ঘটনাকে ‘সমকামী সহিংসতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং সমকামী ও উভকামীদের মাধ্যমে শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। একটি সাত বছরের শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। সেখানে শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয় দেখানো এবং অভিযোগ চাপা দেওয়ার অভিযোগ আছে। এ অবস্থায় যখন বিবৃতিদাতা আলেম সমাজ আলোচনাকে ‘সমকামিতা’র দিকে নিয়ে যায়, তখন ঘটনার প্রাতিষ্ঠানিক দায়ের প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায়। শিশুর বিরুদ্ধে যৌন অপরাধকে সমকামী পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবেও দেখা যায় না।
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিসেফের ২০১৬ সালের যৌথ প্রকাশনা The Islamic Perspective on Protecting Children from Violence and Harmful Practices শিশু যৌন নির্যাতনকে সরাসরি কর্তৃত্বের অপব্যবহার হিসেবে বর্ণনা করেছে। দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশের বিবৃতিদাতা আলেম সমাজ আবাসিক মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে সমকামিতার সঙ্গে যুক্ত করছে। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিসেফের ২০১৬ সালের ওই প্রকাশনায় বলা হয়েছে, শিশুদের এই অপরাধ থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের। তাই মাদ্রাসার শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলা ধর্মীয় শিক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। বরং প্রশ্নটা আরও সাধারণ: রাষ্ট্র কাকে রক্ষা করবে, প্রতিষ্ঠানের সুনামকে, না শিশুকে?
এখানে রাজনৈতিক সমস্যাটা আরও বড়। কোনো অপরাধের কারণকে যদি একটি সামাজিক গোষ্ঠীর পরিচয়ের মধ্যে খুঁজতে শুরু করি, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার কাঠামো অদৃশ্য হয়ে যায়। আলোচনাটি চলে যায় সংস্কৃতি, পরিচয় ও নৈতিক আতঙ্কের দিকে। তাতে সবচেয়ে বেশি লাভ হয় সেই প্রতিষ্ঠানের, যার কাছে জবাব চাওয়ার কথা ছিল।
২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট সরকারি ও বেসরকারি সব কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দেন। অভিযোগ কমিটিতে প্রতিষ্ঠানের বাইরের সদস্য রাখার কথাও বলা হয়। ২০২১ সালের ১৪ মার্চ হাইকোর্টকে আবার বলতে হয়, মাদ্রাসাগুলোকেও আদালতের আগের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট সরকারকে আবার বলতে হয়, কোন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ কমিটি তৈরি হয়েছে তার তালিকা আদালতে দিতে। একই সঙ্গে ২০০৯ সালের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তার ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়।
এখানে রাজনৈতিক ব্যর্থতা কোনো একটি সরকারের একটি সিদ্ধান্তে সীমিত নয়। প্রশ্ন হলো, পুরনো নির্দেশনা কে মানেনি, কে পরীক্ষা করেছে, কত মাদ্রাসায় অভিযোগ কমিটি আছে, কমিটির সদস্য কারা, একজন মুহতামিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কমিটি স্বাধীন থাকবে কীভাবে, ছেলে শিক্ষার্থীরা কোথায় অভিযোগ করবে এবং এই তথ্য সরকার প্রকাশ করে না কেন?
সরকার চাইলে এখান থেকেই কাজ শুরু করতে পারে। পরিদর্শন মানে অধ্যক্ষের অফিসে বসে চা খেয়ে চলে আসা নয়। শিশুদের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে হবে। সাভারের সাত বছরের শিশুটির দিকে তাকালে উত্তরটি কঠিন হওয়ার কথা নয়। মাদ্রাসার দরজার ভেতরে ঢুকেছে বলে সে রাষ্ট্রের নাগরিক থাকা বন্ধ করেনি। তার শরীরের নিরাপত্তা, অভিযোগ করার অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারও দরজার বাইরে রেখে যায়নি। রাষ্ট্রের দায়িত্বও সেই দরজায় এসে শেষ হতে পারে না।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ডক্টরাল ফেলো




