হামজনিত নিউমোনিয়ায় উদ্বিগ্ন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞরা

ছবি: আগামীর সময়
দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব এবং এর ফলে বাড়তে থাকা নিউমোনিয়াজনিত জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা বলছেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এখনই একে জরুরি অবস্থা ঘোষণার মতো পর্যায়ে যায়নি। টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, উপজেলা পর্যায়ে ফিভার কর্নার চালু এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
আজ শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘হামজনিত নিউমোনিয়া: বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত দুই বছরে টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটায় চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ১৫ মার্চ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত দুই মাসে দেশে ৫৪ হাজার ৪১৯ জনের মধ্যে হাম ও হাম সদৃশ উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে ৭০ জন হামে এবং ৩৬৯ জন হাম সদৃশ উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে বলে দাবি করেন বক্তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হামজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো শ্বাসতন্ত্র বিকল হয়ে পড়া এবং নিউমোনিয়া। এ কারণে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞরা সম্মিলিতভাবে সচেতনতা কার্যক্রম শুরু করেছেন এবং সরকারকে দিয়েছেন করণীয় বিষয়ে সুপারিশ।
তাদের প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে— অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হামের টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখা। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ফিভার কর্নার চালুর মাধ্যমে হামপ্রবণ এলাকা শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত হামের চিকিৎসা নির্দেশিকা সব পর্যায়ের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন এবং চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহায়তায় দেশব্যাপী উপসর্গ শনাক্তকরণ ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিয়ে যাচ্ছেন প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা। শিগগিরই সারাদেশে বড় পরিসরে চালু করা হবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হলেও অধিকাংশ রোগী সঠিক পরিচর্যা পেলে সুস্থ হয়ে ওঠে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
এক প্রশ্নের জবাবে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অনেকেই দাবি করছেন হামের সঙ্গে গুটিবসন্তের সংক্রমণও দেখা যাচ্ছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সেগুলো আসলে জলবসন্তের সহ-সংক্রমণ ছিল। তাই অপতথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তারা।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, হামের মতো উপসর্গ অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগেও দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে করোনা ভাইরাস, এডেনো ভাইরাস ও অন্যান্য ভাইরাল সংক্রমণ।
এডেনো ভাইরাসকে তারা সেলফ-লিমিটিং ভাইরাস হিসেবে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে রোগী ভালো হয়ে যায়, যদি যথাযথ সাপোর্টিভ কেয়ার দেওয়া হয়।
হামকে জরুরি অবস্থা বলা যায় কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, প্রতিটি রোগীই আমাদের কাছে জরুরি। তবে আলাদাভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি। সতর্ক থাকতে হবে, কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
উপজেলা পর্যায়ে ফিভার কর্নার চালুর বিষয়ে ওই বিশেষজ্ঞ বলেছেন, করোনাকালীন অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিয়মিতভাবে এ ধরনের কর্নার পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা কমে যাওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক আশিক মোস্তফা বলেছেন, যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণেই অনেক সময় ওষুধ কাজ করে না। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. আবিদ মোল্লা বলেছেন, নবজাতকের শরীরে মায়ের শরীর থেকে পাওয়া প্রতিরোধক্ষমতা কিছু সময় পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়। মায়ের বুকের দুধ থেকেও শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। তবে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
অন্যদিকে ডা. গোলাম সারোয়ার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বিশ্বজুড়েই হাম নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কারও জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।




