হামে ফার্মেসিনির্ভর চিকিৎসায় বাড়ছে জটিলতা-ঝুঁকি
- শুরুতে ফার্মেসিতে চিকিৎসা, পাচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিকও
- ঝামেলা ও খরচ বাঁচাতে এই প্রবণতা
- হামে মৃত্যু ১১০৮, আক্রান্ত ২ লাখ ১৩ হাজার ২৫১

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গত ১০ দিন ধরে ভর্তি হামে আক্রান্ত আফফান ইসলাম। ৪ মাস ১২ দিন বয়সী এই শিশুর জ্বর হলে শুরুতে ফার্মেসি থেকে চিকিৎসা নেওয়া হয়। জ্বর কমাতে খাওয়ানো হয় অ্যান্টিবায়োটিক। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড মহাখালী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রয়োজন হলে সেখান থেকে আনা হয় শিশু হাসপাতালে।
কেরানীগঞ্জের এই শিশুর মা রিনা আক্তার পেশায় শিক্ষক। তিনি বলছেন, ‘শিক্ষিত হয়েও কেন যে ফার্মেসি থেকে ছেলেকে ওষুধ খাইয়েছি, নিজের কাছেই কোনো ব্যাখ্যা নেই। আমাদের ভুলের কারণে বাচ্চাটি মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এলো। আর কত যে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেক টাকাও খরচ হচ্ছে।’
শুধু এই শিশুর অভিভাবক নয়, হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর অভিভাবক বা পরিবারের সদস্য দিয়েছেন একই রকম তথ্য। তারা জানাচ্ছেন, জ্বর, সর্দি-কাশি ও শরীরে র্যাশ দেখা দিলেও অনেকে শিশুকে চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে বাড়ির কাছের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে দিয়েছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের জ্বর কমাতে সাধারণ সিরাপের পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে। শিশুটির যখন হাম-পরবর্তী জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে, তখন তারা ছুটছেন বড় হাসপাতালে।
গাজীপুরের ফিমা আক্তারেরও (৬) জ্বর কমাতে শুরুতে খাওয়ানো হয় ফার্মেসি থেকে কেনা ওষুধ। হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে স্থানীয় তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখান থেকে তিন দিন আগে আসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এই শিশুর বাবা কালাম মাতবর পেশায় একজন সিএনজি অটোরিকশাচালক। তিনি ওষুধ দোকানের বিক্রেতাকেই (মালিক) ডাক্তার মনে করেন। তার ভাষ্য, ‘রোগ হইলে সব সময়ই ফার্মেসির ডাক্তারের ওষুধ খাই। রোগ ভালোও হয়। কোনো অসুবিধা হয় না। এলাকার সবাই ওনার থেকেই ওষুধ নেয়।’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম বলছেন, ‘ফার্মেসি থেকে চিকিৎসা নিয়ে পরে রোগীর অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে নিয়ে আসে। নিয়মিতভাবে এ ধরনের রোগী পাই। খরচ বাঁচাতে এবং হাসপাতালের ঝামেলা এড়াতে অভিভাবকরা এমন করেন। কিন্তু এতে রোগীর নানা ধরনের ঝুঁকি বেড়ে যায়, বিভিন্ন অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি হয়। পাশাপাশি রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের এমন ব্যবহারে রোগী অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যায়।’
বিবিএসের হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে ফার্মেসি ও অনানুষ্ঠানিক চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা খুব বেশি। ৫১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ নিজেরা কাছের ফার্মেসি থেকে চিকিৎসা নেন। এর বাইরে ৪ দশমিক ৯ মানুষ হাতুরে চিকিৎসকের কাছে যান। মাত্র ১১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেন।
এই জরিপে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৮৬ জন এবং ৪৭ হাজার ৪০টি পরিবার অন্তর্ভুক্ত ছিল। জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয় ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত।
আবার ২০২৪ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক ফার্মেসি থাকায় প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার একটি বড় সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হামের প্রাদুর্ভাবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই আক্রান্তদের বড় অংশ। মারা যায় বেশি দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা। হামের প্রাদুর্ভাবের সময় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও অভিভাবকদের সন্দেহজনক হামের রোগীকে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট আবিদ হোসেন মোল্লা বলছেন, ‘হামে মূলত শিশুরা আক্রান্ত হয়। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকে। আবার হামে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও কমিয়ে দেয়। হামের চিকিৎসা দেরিতে শুরু হলে, শিশুটি দ্রুত খারাপ হয়ে যেতে পারে। ফার্মেসি থেকে হাম কেন, কোনো রোগেরই চিকিৎসা নেওয়া যাবে না।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক এই প্রধান আরও বলেছেন, ‘ফার্মেসি থেকে চিকিৎসা নিলে প্রথমত রোগ শনাক্ত এবং চিকিৎসায় ভুল হবে। জটিলতার লক্ষণ থাকলেও তা সময়মতো শনাক্ত হবে না। দ্বিতীয়ত, শিশুটি সঠিক চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ায় ঝুঁকি বেড়ে যাবে, সেটা কখনো কখনো মৃত্যু অবধি যেতে পারে।’
কেন রোগীরা ফার্মেসিতে যায়— এমন প্রশ্নের জবাবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইকবাল বলছেন, ‘ফার্মেসির লোক একই এলাকার বলে পূর্বপরিচিত থাকে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সহজ হয়। মন খুলে সমস্যার কথা বলতে পারেন। কিন্তু হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসক রোগীকে খুব বেশি সময় দিতে পারেন না। এ ছাড়া, হাসপাতালে নানান নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয় যা সময়সাপেক্ষ। আবার, এতে চিকিৎসকের ফি, টেস্ট, যাতায়াতের খরচ এড়ানো যায়।’
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলছেন, ‘হামে অনেক শিশু মারা গেছে, যেখানে প্রতিরোধযোগ্য রোগে একটা শিশুর মৃত্যুও কাম্য নয়। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের প্রবণতা এবং দেরি করে হাসপাতালে আসাও হামে মৃত্যুর একটি কারণ। হাসপাতালগুলো আরও রোগীবান্ধব এবং রেফারেল সিস্টেম চালু করা গেলে, এ সমস্যা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। সরকার সেজন্য কাজ শুরু করেছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে হাম ও হাম উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৮। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ হাজার ৩৩৯ জন। আর এ বছর হাম ও হাম উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ১৩ হাজার ২৫১ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যু সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে।



