ঘোর সংকটে রক্ষার ৫ পথ
- রবিবার স্মরণকালের সর্বোচ্চ ৩৬৭১ মেগাওয়াট লোডশেডিং

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কখনো গ্যাস, কখনো কয়লাসংকট। বর্তমানে সমান্তরালে চলছে এই দুই সংকট। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশ জুড়ে দেখা দিয়েছে অসহনীয় লোডশেডিং। দীর্ঘদিন ধরে অল্প অল্প করে জমতে থাকা এ সমস্যা এখন প্রকট। ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। উদ্বিগ্ন সরকার। সমাধানের উপায় কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহসা এখান থেকে মুক্তির উপায় নেই। তবে কিছুটা সময় লাগলেও পাঁচ উপায়ে স্বস্তি মিলবে গ্যাস-বিদ্যুতে। সেজন্য আন্তরিক থাকতে হবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের। উপায়গুলো হলো— এ খাতে অযৌক্তিক ব্যয় কমানো, সৌরবিদ্যুতে জোর দেওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানিসাশ্রয় এবং গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগী হওয়া।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ১২ থেকে ১৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো। এতে অন্তত ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
গতকাল রবিবার বিকাল ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট উৎপাদন হওয়ায় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। আগের দিন একই সময়ে চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৭৭ মেগাওয়াট। আর লোডশেডিং ২ হাজার ৯৫৮ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি: বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। এজন্য অন্তত ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। এই জ্বালানি সংকটের কারণে কখনোই উৎপাদন করা যায়নি চাহিদামতো বিদ্যুৎ।
ন্যূনতম ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা গেলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে পরিস্থিতি। এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সরবরাহ নেমেছে ৬৮ কোটিতে। এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল আংশিক মেরামত শেষে প্রায় ২২ কোটি থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও বিদ্যুতের সরবরাহ আগের মতোই। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩৭০০ থেকে ৩৮০০ মেগাওয়াটে নেমেছে। কিছুদিন আগেও উৎপাদন হতো সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট— ব্যাখ্যা করলেন পিডিবির কর্মকর্তারা।
গ্যাসসংকটে বড় ভরসা কয়লা-বিদ্যুতে। কিন্তু সেখানেও উৎপাদন কমছে কয়েক দিন ধরে। বর্তমানে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতা ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার ১০০-৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের মতো। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহন ও আনলোডিংয়ে সমস্যা হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে উল্লেখ করলেন পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম।
এদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ারও। গতকাল গড়ে ৮০০ থেকে সাড়ে ৮০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ বৃহস্পতিবারও কেন্দ্রটি থেকে সরবরাহ করা হয় ১ হাজার ৪৫৮ মেগাওয়াট। এ ঘাটতির কারণ জানতে কয়েকবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি আদানি পাওয়ারের বক্তব্য। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সংকটের কথা জানিয়েছে একটি সূত্র।
ঘাটতি সামাল দিতে বেড়েছে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার। এ ধরনের কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৬ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। সেখান থেকে কয়েক দিন আগে উৎপাদন হচ্ছিল ৩ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত। ব্যয় সামাল দিতে এখন তা নেমেছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার মেগাওয়াটে। বকেয়া পরিশোধ না করায় জ্বালানি তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ার কারণেও কমেছে উৎপাদন।
সংকট সমাধানে ৫ উপায়: কমে আসছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন। অন্যদিকে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধার কারণে চাইলেই উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির সুযোগ নেই। আবার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। এমন পরিস্থিতিতে কয়লা-বিদ্যুতের পাশাপাশি বড় ভরসা সৌরবিদ্যুতে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, দীর্ঘদিনের এ সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সুযোগ আছে। সেজন্য প্রথমেই এ খাতে অযৌক্তিক ব্যয় কমাতে হবে। সরকারের মুনাফা করার মানসিকতা থেকে বের হওয়ার পাশাপাশি অযোগ্য লোকদের সরিয়ে সঠিক স্থানে সঠিক লোক বসাতে হবে। একই সঙ্গে বিচারের আওতায় আনতে হবে জ্বালানি অপরাধীদের।
‘এ মুহূর্তে সংকট কাটাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো খুবই জরুরি। ব্যয়বহুল ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করলে ৪২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, যা দিয়ে বছরে ২ টন কয়লা আমদানি সম্ভব। এতে তুলনামূলক কম দামে বাড়ানো যাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন’— যোগ করলেন তিনি।
অভিন্ন পরামর্শ দিলেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম। তিনি মনে করেন, পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে অনেক কমে আসবে চাপ। এসবের পাশাপাশি সাশ্রয়ী হওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এসির তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেট থেকে ১ ডিগ্রি করে বাড়ালে প্রতি এক ডিগ্রির জন্য সাশ্রয় হয় অন্তত ৬ শতাংশ বিদ্যুৎ। পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ করে কারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমেও রয়েছে সাশ্রয়ের সুযোগ।
এ অবস্থায় সাশ্রয়ী হওয়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিলেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা: আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়া ও ঋণের দায় চেপেছে বর্তমান সরকারের ওপর। এ কারণে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনা কঠিন।
পিডিবির কাছে সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিল পাওনা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পাবে ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো। বকেয়া আদায়ে বেসরকারি কেন্দ্রের মালিকরা চাপ দিচ্ছেন। জ্বালানি কেনার অর্থ নেই এমন দাবি করে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করছেন না তারা। আবার এত বিশাল বকেয়া পরিশোধের সামর্থ্যও এ মুহূর্তে সরকারের নেই।
চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এখন বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বললেন, আগের সরকারের ভুল নীতির কারণেই সৃষ্টি হয়েছে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি। উৎপাদন না করেও অলস কেন্দ্রগুলোর জন্য ব্যয় করতে হচ্ছে বিপুল অর্থ। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার।
আপাতত সংকট সমাধানের জন্য সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি ফোন করে তার সহায়তা চেয়েছেন বলে জানালেন প্রতিমন্ত্রী।





