১৫ ফাঁসির আসামির হদিস জানে না সরকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে এ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির সবাই পলাতক। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে থাকার বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্য থাকলেও বাকিদের অবস্থান অজানা।
এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘কেউ যদি বিচার মোকাবিলা করতে না চেয়ে পলাতক থাকেন, তাহলে তো আইনের বিধান অনুযায়ী পলাতক ব্যক্তির বিরুদ্ধে যেভাবে বিচার হয়, সেভাবেই আমাদের বিচার চলছে। এখন রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের না আনা যায় অথবা তারা আত্মসমর্পণ করেন কিংবা গ্রেপ্তার হন, ততক্ষণ তো রায় কার্যকরের সুযোগ নেই।’
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় এ পর্যন্ত ছয়টি মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আলোচিত ছয়টি রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১১ জনকে যাবজ্জীবন ছাড়াও ৩৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত ৬২ আসামির মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনই পলাতক।
প্রসিকিউশন সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বর্তমানে আরও ১৫টি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আরও আটটি মামলা চলমান। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ২৮২ জনকে।
এ ছাড়া ট্রাইব্যুনাল-১-এর অধীন তদন্তাধীন মামলা রয়েছে ২৮টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এর অধীন রয়েছে আটটি মামলা। এসব মামলায় অভিযুক্ত রয়েছেন ১৪৫ জন।
চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল যে আর্থিক জরিমানা করেছেন, সেগুলো আদায়ের প্রক্রিয়া তারা শিগগির শুরু করবেন। তিনি বলেছেন, ‘যাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ আছে, যে ফাইনগুলো আছে বা সম্পত্তি কনফিসকেশনের যে আদেশগুলো আছে— সেগুলো কীভাবে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আসামি পলাতক থাকা সত্ত্বেও এটা করা যাবে।’
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই মামলার আসামি থেকে ‘রাজসাক্ষী’ হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। ঐতিহাসিক এই রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশের পাশাপাশি নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে এবং আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ দ্বিতীয় রায়ে রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।
এরপর ৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ অন্য একজনকে হত্যার ঘটনায় সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এ ছাড়া আরও সাত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও দুজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনাল-২ রংপুরে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ৯ এপ্রিল। রায়ে এই মামলার অন্য ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গণঅভ্যূত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি এবং একই এলাকায় আরও দুজনকে হত্যার ঘটনায় গত ২৮ জুন তিনজনের মৃত্যুদণ্ড, একজনের যাবজ্জীবন ও অন্য এক আসামিকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
এ ছাড়া ছাত্র-জনতাকে আটক ও নির্যাতন এবং ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ততার অভিযোগে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে তিনটি অপরাধে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তবে তিন অপরাধে ৩০ বছরের সাজা হলেও সাজাগুলো একই সঙ্গে কার্যকর হবে বলে রায়ে বলা হয়েছে। ফলে ইনুকে কার্যত ১০ বছরের সাজা ভোগ করতে হবে।





