টার্গেট ছিলেন নেতা প্রাণ গেল কর্মীর
- কাফরুলে যুবদল কর্মী খুন
- নেপথ্যে দলীয় অন্তঃকোন্দল ও কমিশনার নির্বাচন
- ঝিনাইদহ থেকে ভাড়া করা হয় ৪ শুটার
- গ্রেপ্তার চঞ্চল ৩ দিনের রিমান্ডে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর মিরপুর-১৩ নম্বরে শুক্রবার রাতের গুলিতে নিহত যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী ওরফে পারভেজ ছিলেন না হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য। তাদের টার্গেটে ছিলেন মিরপুর থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুর রহমান বাবু। তবে শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি। গুলিতে নিহত হন ইউসুফ। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দলীয় আধিপত্য, কমিশনার নির্বাচন এবং জমির ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় এক মাস আগে হাফিজুর রহমান বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঝিনাইদহ থেকে চারজন ভাড়াটে শুটারকে ঢাকায় আনা হয়। তাদের তিন দিন রাখা হয় মিরপুর-১০ নম্বরের একটি আবাসিক হোটেলে। এরপর সুযোগ বুঝে হামলার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিরপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য, জমির ব্যবসা এবং কমিশনার নির্বাচন ঘিরে দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। হাফিজুর রহমান বাবু কমিশনার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন যুবদলের আরেক নেতা, তার নামও হাফিজ। একসময় তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলে সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তদন্তকারীদের ধারণা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দিতেই শুটার ভাড়া করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে মিরপুর-১৩ নম্বরের ই-ব্লকের ওপেপেক্স গার্মেন্টসের সামনে হাফিজুর রহমান বাবুসহ তার অনুসারীরা প্রতিদিনের মতো আড্ডা দিচ্ছিলেন। সেখানে ছিলেন যুবদল কর্মী ইউসুফও।
নিহতের রাজনৈতিক সহকর্মী মামুন মিয়া জানান, তিন থেকে চারজন অপরিচিত ব্যক্তি তাদের পাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করছিলেন। সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ইউসুফ তাদের পরিচয় জানতে চান। কিছুক্ষণ পরই ওই ব্যক্তিরা আগ্নেয়াস্ত্র বের করে গুলি ছোড়ে। একপর্যায়ে চঞ্চল মোল্লা কাছ থেকে ইউসুফের বুকে গুলি করেন।
ঘটনাস্থলে থাকা হাফিজুর রহমান বাবুর কর্মী সুজন বলেন, “ইউসুফ ভাই সন্দেহজনক কয়েকজনকে দেখিয়ে আমাদের সতর্ক করেন। আমিও হাফিজুর ভাইকে ফোন করে বলি, এখানকার পরিস্থিতি ভালো না। তখন ভাই আমাদের ওদের ধরতে বলেন। আমরা ধাওয়া করলে তিনজন দৌড় দেয়। ১ নম্বর রোডের কাছে তাদের আটকে কারণ জানতে চাই। এ সময় একজন কোমর থেকে অস্ত্র বের করার চেষ্টা করলে ইউসুফ ভাই তাকে জাপটে ধরেন। তখন চঞ্চল খুব কাছ থেকে ইউসুফ ভাইকে গুলি করে। এরপর আমার দিকে দুই রাউন্ড এবং হাফিজুর ভাইয়ের দিকেও দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে। তবে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে দুই পথচারীর গায়ে লাগে।”
ঘটনাস্থলেই স্থানীয় লোকজন অস্ত্রসহ চঞ্চল মোল্লাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এ ঘটনায় নালাম সরদার (৪৫) ও মনির হোসেন (৩২) নামে আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হন। তারা বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঘটনার পর নিহতের ভাই মাসুদ রানা বাদী হয়ে কাফরুল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় চঞ্চল মোল্লা, জিহাদ মোল্লা, জিয়ারুল মোল্লা ও হাসানকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাত আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শনিবার মাগুরা থেকে জিয়ারুল মোল্লা ওরফে জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার আগে ঘটনাস্থল রেকি করা নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান এবং সাফিন ছৈয়াল ওরফে সাফিন আহাম্মেদকেও আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে দাবি তদন্তকারীদের। গ্রেপ্তার চঞ্চলকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার রাকিব খান বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে একজন শুটারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া হামলার আগে ঘটনাস্থল রেকি করা দুজনকেও আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে হত্যার মূল কারণ হিসেবে জানা গেছে।




