প্রিয় ৫ বই
- ওয়ার অ্যান্ড পিস — লিও তলস্তয়
- অভাজন — ফিওদর দস্তয়েভস্কি
- লাঞ্ছিত নিপীড়িত — ফিওদর দস্তয়েভস্কি
- অ্যান্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দ্য ডন — মিখাইল শলোকভ
- ইস্পাত — নিকোলাই অস্ত্রোভস্কি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশি-বিদেশি প্রিয় লেখকের কথা বলতে গেলে যেন ফিরে যাই আমার একান্ত নিজের পাঠ-জীবনে। বইয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা বড় অদ্ভুত— কখনো প্রথম দেখায় প্রেম, কখনোবা দীর্ঘ অপেক্ষার পর ধীরে ধীরে গাঢ় হওয়া বন্ধুত্ব। তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল দ্বিতীয় রকমের। পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলা হয় একে, অথচ স্কুলে-ইন্টারমেডিয়েটে যতবার হাতে নিয়েছি, ভেতরে ঢুকতে পারিনি। অনার্স পড়ার সময় জেদ চাপল— না, একে জয় করতেই হবে। তখন ননী ভৌমিকের অনুবাদটা জোগাড় করলাম। প্রথম আশি-নব্বই পৃষ্ঠা টেনেটুনে পার হতেই হঠাৎ মনে হলো আমি যেন সত্যি সত্যি যুদ্ধের ভেতর ঢুকে যাচ্ছি, রাশিয়ার তুষারমাখা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের শ্বাস-প্রশ্বাস টের পাচ্ছি। তারপর সেই দুই হাজার পৃষ্ঠার মহাকাব্য এক নিঃশ্বাসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে গেলাম— এ উপন্যাস যুদ্ধ ও শান্তি নামে এক বিশাল ক্যানভাসে ব্যক্তি-মানুষের ভাগ্য আর ইতিহাসের নির্মম গতিপ্রকৃতিকে একাকার করে দেয়। দস্তয়েভস্কির কাছে আমার ঋণ অপরিশোধ্য। ‘অপরাধ ও শাস্তি’ বা ‘ব্রাদার্স কারামাজভ’-এর কথা সবাই বলে কিন্তু আমি আজীবন বিস্মিত হই আরেকটি উপন্যাসের জন্য, যার কথা কেউ বলে না— ‘অভাজন’। ননী ভৌমিকের অনুবাদেই পড়া। এ বই এক সরল, নির্মল হৃদয়ের রাজপুত্রের ট্র্যাজেডি, যাকে তার নিষ্পাপ ভালোবাসা আর আন্তরিকতার জন্য সমাজ ‘ইডিয়ট’ আখ্যা দেয়, অথচ সেই তথাকথিত পাগলই ধারণ করে সবচেয়ে খাঁটি মানবিকতা। আর ‘লাঞ্ছিত নিপীড়িত’— এ তো বিষাদসিন্ধু! দারিদ্র্য, শোষণ আর আত্মত্যাগের এমন করুণ মানবিক দলিল যে, পড়ার পর কয়েক দিন যেন নিজেকে আর চেনা পৃথিবীকে বিষণ্ণ এক চাদরে ঢাকা লেগেছিল। মিখাইল শলোকভের ‘অ্যান্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দ্য ডন’-এর কথাও কেউ খুব একটা বলে না। অথচ এই একটি উপন্যাসই লেখককে নোবেল এনে দিয়েছিল। ডন নদীর তীরের কসাক সমাজের জীবন, প্রেম, যুদ্ধ আর বিপ্লবের আবর্তে মানুষের যন্ত্রণা এত গভীরে চিত্রিত যে, আমাদের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ বা ‘পদ্মানদীর মাঝি’র মতো নদী এ উপন্যাসেরও অন্যতম প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠে, যে বয়ে চলে জীবনের চিরন্তন স্রোত।
‘ইস্পাত’— অস্ত্রোভস্কির এ উপন্যাস কিশোর-যৌবনে এক প্রবল দীপ্তি হয়ে এসেছিল। এক তরুণ বিপ্লবীর দুরন্ত সাহস আর আদর্শের প্রতি অটল আস্থার গল্প, যেখানে মানুষ নিজেকে ইস্পাতের মতো কঠিন করে গড়ে তোলে— পড়ার সময় মনে হতো, বুকের ভেতরও যেন আগুন জ্বলে উঠছে। আরেক বিস্ফোরণ ছিল হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’। এক বুড়ো জেলে, প্রকাণ্ড এক মাছ আর সমুদ্রের বুকে একাকী একটানা যুদ্ধ— এ সরল কাঠামোয় হেমিংওয়ে আসলে জীবনের কাছে মানুষের অপরাজেয় আত্মার মহিমা এঁকেছেন, যেখানে হারতে পারো কিন্তু হার মানতে নেই। আর কামুর ‘আউটসাইডার’— সে এক স্থাণু আঘাত। জীবনের সব অর্থহীনতা আর নিয়তির প্রতি এক নিস্পৃহ, নির্বিকার আত্মসমর্পণের কাহিনি পড়ে মনে হয়েছিল, পৃথিবী নামের এ গ্রহে আমরা আসলে সবাই কেমন বড় একা, একেকজন পরম বিচ্ছিন্ন ‘আউটসাইডার’।
অনুিলখন: শিমুল সালাহ্উদ্দিন




