সাহিত্য সুষমার সঙ্গে সাহিত্য সাংবাদিকতাও

‘কাজললেখা’ প্রকাশনা শুরু হলো আজ— দৈনিক আগামীর সময়ের সাহিত্য সাময়িকী হিসেবে। পাতার নামই যেন বলছে, যোগ্য নির্বাচিত লেখার কপালে কাজলের টিপ পরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে এ পাতার। প্রতি শুক্রবার ভোরের আলো ফোটার আগেই এ দুই পাতা ব্রডশিটের কাগজ পাঠকের হাতে যাবে, যার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকবে এক অপার আনন্দের সম্ভাবনা। পরিসর খুব বেশি নয়, অথচ এই ছোট্ট জায়গাটুকুর মধ্যেই আমরা দেখতে চাই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মিতালি। এক পিঠে চিরায়তের গভীর সাধনা, অপর পিঠে সমকালীন সময়ের তীব্র স্পন্দন। এই দুই সুর মিলিয়েই ‘কাজললেখা’ হয়ে উঠবে এমন এক পাতা, যা আমাদের চেনা সাহিত্যপাতার বৃত্ত থেকে নিজেকে সরিয়ে আনবে অন্য কোথাও, অন্য কোনো উচ্চতায়।
প্রথম পাতাটি হবে ক্ল্যাসিকের জন্য নির্ধারিত— গল্প, কবিতা, সমালোচনা। কিন্তু এই পরিসর কখনোই অতিদীর্ঘ হবে না; সীমিত জায়গা স্পর্শকাতর খুব, ফলে এখানে কোনো আপস করা চলবে না। আমাদের একটাই চিন্তা থাকবে— নাম দেখে নয়, লেখার মান বিবেচনায় লেখা প্রকাশ। কে লিখল তা নয়, কী লিখল সেটাই হবে বিবেচ্য। ‘কাজললেখা’ সেই প্রাচীর ও প্রচল ভাঙতে চায়— আমরা ফিরতে চাই সেই পুরনো দিনের আদর্শে, যখন কোনো কিশোরের নিউজপ্রিন্টে লেখা চিঠি সম্পাদকের টেবিলে এসে পৌঁছাত, আর সম্পাদক লেখকের নাম না জেনেও লেখাটি ছেপে দিতেন, কারণ লেখাটা ‘ভালো’। এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই আমাদের প্রধান পুঁজি। এই পাতায় কবিতার পাশাপাশি জোর পাবে সাহিত্যবিষয়ক গদ্য। প্রবন্ধ, মূল্যায়নধর্মী লেখা কিংবা বিদেশি কবিতার অনুবাদ— যে অনুবাদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নয়; ভাষার কারুকাজে সিদ্ধহস্ত এমন একজন মানুষের হৃদয় ও স্নায়ু দিয়ে তৈরি হবে। আমরা চাই এমন কিছু নিরীক্ষাধর্মী লেখা, যা বাংলা সাহিত্যের চিরাচরিত খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারে— ফ্ল্যাশ ফিকশন, লিমেরিক অথবা নিবিড় কোনো সাহিত্যতত্ত্বের ধারাবাহিক আলাপ। মোটকথা, এই প্রথম পাতার প্রতিটি শব্দ আর বাক্য বিচার্য হবে একটিমাত্র মাপকাঠিতে— উৎকর্ষ।
দ্বিতীয় পাতাটিই হবে ‘কাজললেখা’র ব্যতিক্রম সন্ধানের চিহ্নবাহী। এখানে আমরা কবিতা বা গল্প ছাপাব না; বরং এই পুরো পাতায় থাকবে সাহিত্যের খবর আর খবরধর্মী ফিচার এবং টুকরো খবর। যে প্রশ্নটা শুরু থেকেই আমাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে— ‘কী করা যায়, যা আমাদের সাহিত্যপাতাগুলো করে না?’ তার সবচেয়ে সহজ এবং সাহসী উত্তর পাঠক পাবেন দ্বিতীয় পাতাতেই। আমরা সাহিত্যজগতের খবর ছাপাব। যেমন— সিনেমা বা সংগীতের জগৎ নিয়ে খবরের পাতা তৈরি হয়, যেখানে থাকে নতুন মুক্তি, তারকাদের উত্থান-পতন, বিতর্ক, আড্ডার গল্প; ঠিক তেমনিভাবে সাহিত্য নিয়েও তো এমন একটি পাতা হতে পারে! এখানে থাকবে বই ও প্রকাশনার খবর, লেখকদের জীবনের অজানা অধ্যায়, সাহিত্যের অন্দরমহলের তর্ক-বিতর্ক, এমনকি ছোটখাটো গণ্ডগোলের কথাও। তবে এই পাতা নিছক চটুলতার জন্য নয়। খবরধর্মী ফিচারই হবে এর মূল শক্তি। আমরা জানতে চাই, কীভাবে একটি গল্প বা কবিতার জন্ম হয়। একটি চরিত্রের পেছনে কোন বাস্তব মানুষ লুকিয়ে? কোনো সৃষ্টির নেপথ্যে কোন প্রেম, প্রতারণা, নিঃসঙ্গতা কিংবা তীব্র অভিমান কাজ করেছিল? এখানে সেই সব গল্প ছাপা হবে, যা এতদিন কেবল আড্ডার টেবিলেই আটকে ছিল। একজন লেখক কীভাবে লেখক হয়ে ওঠেন, তার সংগ্রাম, নিরন্তর পড়ার অভ্যাস, জীবনযাপনের টানাপড়েন— এসব নিয়েই ‘এ সপ্তাহের লেখক’ কলাম হতে পারে। তা ছাড়া আমরা আয়োজন করতে পারি গোলটেবিল আলোচনার, যেখানে সমসাময়িক কোনো বই, চলচ্চিত্র বা সাহিত্য-ইস্যু নিয়ে একদল মানুষ তর্ক করবেন, আর সেই কথোপকথন লিপিবদ্ধ হয়ে ছবিসহ এ পাতায় প্রকাশিত হবে। বিশ্বসাহিত্যের সংবাদ, পুরস্কার, আন্দোলন— এই সবকিছুর একটি জানালা এখানে খোলা থাকবে, যাতে একজন পাঠক শুধু বাংলা নয়; গোটা বিশ্বের সাহিত্যস্পন্দন অনুভব করতে পারেন হাতের মুঠোয়। সঙ্গে থাকবে প্রতি পক্ষে একটি ধারাবাহিক উপন্যাসের একটি করে পর্ব।
এ দুই পাতার এই বিন্যাসই ‘কাজললেখা’কে দেবে এক স্বতন্ত্র চরিত্র, তা আমরা বিশ্বাস করি। প্রথম পাতায় পাঠক খুঁজে পাবেন গভীরতা, ধ্যান, চিন্তার খোরাক। দ্বিতীয় পাতায় পাবেন গতি, প্রাসঙ্গিকতা আর জীবনের ঘ্রাণ। আমরা আরও চাই, এই পাতা শুধু রাজধানীমুখী না থেকে ছড়িয়ে পড়ুক সব জেলা-উপজেলায়। অখ্যাত চারণকবির জীবন ও সংগ্রামের সাক্ষাৎকার যেমন দ্বিতীয় পাতায় স্থান পাবে, তেমনি তার শ্রেষ্ঠ কবিতাটি স্থান পাবে প্রথম পাতায়— নামের জৌলুস নয়, অক্ষরের ঔজ্জ্বল্যই এখানে শেষ কথা বলবে। এই আয়োজন যতটা না নিয়মের, তার চেয়ে বেশি বিশ্বাসের। সম্পাদকীয় নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির ঠিকঠাক বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে ‘কাজললেখা’র ভবিষ্যৎ। এর সৌকর্য নির্ভর করবে বাংলা ভাষার নবীন-প্রবীণ সব লেখকের মেধা ও পরিশ্রমের ওপর। কারণ, কাজললেখা তাদেরই কণ্ঠস্বর। ‘কাজললেখা’ হয়ে উঠুক প্রতিটি শুক্রবারের অপেক্ষা— অক্ষরের জাদুতে মোড়া চিরায়তের গাম্ভীর্য ও সমকালীনতার উচ্ছলতায় উদ্ভাসিত এক টুকরো উজ্জ্বল জানালা।
কাজললেখায় আপনার লেখা পাঠান [email protected] ঠিকানায়। ডাকযোগে লেখা পাঠাবেন যে ঠিকানায় তা হলো— শিমুল সালাহ্উদ্দিন, বিভাগীয় সম্পাদক, কাজললেখা, আগামীর সময়, সপ্তম তলা (লিফটের ৬), ইডিবি ট্রেড সেন্টার, ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।






