২১০০ কবর খুঁড়েছেন জাকির

মানুষের সেবামূলক কাজে জাকির হোসেন
জাকির হোসেন (৩৮) কারও মৃত্যুসংবাদ পেলেই কবর খুঁড়তে খুন্তি, কোদালসহ প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম নিয়ে ছুটে যান কবরস্থানে। কবর খুঁড়ে যাচ্ছেন ছেলেবেলা থেকেই। এজন্য নেননি কোনো পারিশ্রমিক। তার ডায়েরির তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত তিনি কবর খুঁড়েছেন ২ হাজার ১০০টি।
রংপুর নগরীর লালবাগ পূর্ব বালাপাড়া এলাকার নামকরা গোরখোদক প্রয়াত মনছুর আলীর ছেলে তিনি। কবর খোঁড়ায় বাবার কাছেই তার হাতেখড়ি।
কবর খুঁড়তে দূরের যাত্রায় দ্রুত পৌঁছাতে অভাবের সংসারে কষ্ট করে কয়েক বছর আগে কিস্তিতে একটি মোটরসাইকেল কিনেছেন তিনি। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন দক্ষ গোরখোদক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। এ পর্যন্ত যাদের কবর খুঁড়েছেন তিনি, তাদের মৃত্যুর দিন-তারিখ সব লিখে রেখেছেন নিজের ডায়েরিতে।
রংপুর সিটি করপোরেশনের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মিজানুর রহমান মিজু জানালেন, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সুনামের সঙ্গে কবর খুঁড়েছেন জাকিরের বাবা মনছুর আলী। তিনি ছিলেন লালবাগ বালাপাড়া কবরস্থানের চৌকিদার।
জাকির হোসেন জানিয়েছেন, চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছোট হওয়ায় বাবা খুব আদর করতেন। কোথাও কবর খুঁড়তে গেলে তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। বসে বসে তার কবর খোঁড়া দেখতেন। স্কুলে পড়াকালে কখনো বাবার নির্দেশনায় ছোট শিশুর কবর খুঁড়তে হয়েছে তাকে। সেখান থেকেই শেখা। ২০১৫ সালে বাবার মৃত্যুর পর পুরোদমে কবর খোঁড়ার কাজে লেগে যান তিনি। এ পর্যন্ত ২ হাজার ১০০ কবর খুঁড়তে পারায় জাকির গর্ব করেন, ‘প্রথমত কবর খোঁড়া সওয়াবের কাজ। দ্বিতীয়ত, সফল গোরখোদক বাবার কাজ ধরে রাখতে পেরেছি। বাবার মতো মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নিঃস্বার্থভাবে মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।’
রংপুর নগরীর ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠন বাংলার চোখের চেয়ারম্যান তানবীর হোসেন আশরাফি জানিয়েছেন, তার বাবার কবর জাকিরই খুঁড়েছিলেন। কবর খুঁড়ে কারও কাছ থেকে টাকা নেননি তিনি। কবর খোঁড়ার ডাক পেলেই ছুটে যান।
২০১৫ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর অভাবের সংসার চলছিল না দশম শ্রেণি পড়াশোনা করা জাকিরের। বিষয়টি রংপুর সিটি করপোরেশনের লালবাগ বালাপাড়া কবরস্থান কর্তৃপক্ষও জানত। অল্প বয়স থেকে কবর খোঁড়ায় অভিজ্ঞ জাকির হোসেনকে তারা ওই কবরস্থানের চৌকিদার হিসেবে নিয়োগ দেয়। সেই থেকে কবর আর কবরস্থান নিয়ে দিন কাটে জাকিরের। কবরস্থানের চৌকিদার হিসেবে প্রতি মাসে বেতন পান ৭৫০০ টাকা। এ ছাড়া কবরস্থানের কাছেই তার একটি ছোট্ট পানের দোকান আছে।
‘অভাবের সংসারে কষ্ট হয়। কিন্তু কবর খোঁড়ার জন্য প্রতিদিন যখন জাকিরের ডাক আসে, তখন ভালো লাগে এই ভেবে যে, সে ভালো কাজে যাচ্ছে। এজন্য গর্ব হয় আমার’, বলছিলেন জাকিরের স্ত্রী নাজমা আক্তার।




