একই গুরুর দুই শিষ্যের ফাইনাল

(বামে) লুইস দে লা ফুয়েন্তে, (ডানে) লিওনেল স্কালোনি
‘যে তোরে পাগল বলে, তারে তুই বলিস নে কিছু’— রবীন্দ্রনাথের গানের এই কথাগুলো কি কোনোভাবে গিয়েছে মার্সেলো বিয়েলসার কানে? তিনি তো আর্জেন্টিনায় গিয়েছেন, ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর জীবনে তার অশেষ প্রভাব। পাগলাটে বিয়েলসা কি ওকাম্পোর করা গীতবিতানের অনুবাদ পড়েছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা নেই, তবে বিয়েলসা যার নামের সঙ্গে ‘এল লোকো’ বা পাগল বিশেষণটা উপাধির মতোই স্থায়ী হয়ে গেছে; আধুনিক ফুটবল দর্শনে এই সময়ে তিনিই প্রধান তাত্ত্বিক। ফুটবলের এই ‘পাগলা বাবা’ নিজে তার খ্যাপাটে আচরণ আর অনমনীয় আচরণের জন্য কোচ হিসেবে খুব বড় কোনো সাফল্য পাননি, কিন্তু তার দেখানো কৌশলের সফল বাস্তবায়নেই বিশ্বকাপ জিতেছেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। চার বছর পর স্কালোনির সামনে সেই শিরোপা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে শেষ লড়াইয়ের প্রতিপক্ষ বিয়েলসারই আরেক শিষ্য লুইস দে লা ফুয়েন্তে, যার কৌশলে অদম্য ফ্রান্সকে দমবন্ধ ফাঁসের ফাঁদে ফেলে বিদায় করেছে স্পেন। সেই দুই দলই এখন ফাইনালে।
সময়টা ২০১১ সাল। আলাভেস তাদের কোচের পদ থেকে ছাঁটাই করেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে। প্রায় ১৮ মাস কোনো চাকরি ছিল না তার। এই সময়টায় ফুয়েন্তে রোজ যেতেন অ্যাতলেতিক বিলবাওয়ের অনুশীলনে। সে সময়টায় বিয়েলসা মাত্রই বিলবাওয়ে এসেছেন, বাস্ক অঞ্চলের ক্লাবটি সেই মৌসুমে ইউরোপা লিগের ফাইনাল ও কোপা দেল রের ফাইনালে। ফুয়েন্তে বিয়েলসার অনুমতি নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই যেতেন অনুশীলনে, সাইড লাইনে দাঁড়িয়ে দেখতেন কীভাবে দলকে প্রশিক্ষণ দেন বিয়েলসা, সেসব ভিডিও ধারণ করতেন। এভাবেই বিয়েলসার ট্রেনিং ফুটেজের বিশাল এক আর্কাইভ বানিয়েছিলেন ফুয়েন্তে। এরপর স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন যখন তাকে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়, নতুন জায়গায় বিয়েলসার কোচিং থেকে শেখা কৌশলগুলো কাজে লাগিয়েছেন ফুয়েন্তে। ২০২২ বিশ্বকাপের পর তিনি দায়িত্ব নেন স্পেন জাতীয় দলের।
লিওনেল স্কালোনিও বিয়েলসার কোচিং পদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত। ২০০২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোচ ছিলেন বিয়েলসা। বিশ্বকাপে হেরে বিদায় নেওয়ার পর বিয়েলসা বলেছিলেন, ‘কোচদের মূলত তাদের নিজস্ব ফুটবল ঘরানা বা স্টাইলের জন্যই নিয়োগ দেওয়া হয়। আমরা সাড়ে চার বছর ধরে আমাদের সেই খেলার শৈলী প্রকাশ করেছি এবং বিশ্বকাপে আমরা সেই স্টাইলেই অটল ছিলাম।’ বিয়েলসার কথাগুলো মগজে গেঁথে যায় স্কালোনির। সেটা ধারণও করেন তিনি।
বিয়েলসার শিষ্যরা সফল, অথচ বিয়েলসা নিজে কেন সাফল্যের স্বাদ পান না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দারুণ একটা বিশ্লেষণ করেছে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কন্ট্রা। তারা দেখিয়েছে, বিয়েলসা কাজ আদায় করতে চান চাপের মুখে। তার দলে খেলোয়াড়দের ভেতর আস্থার বদলে তৈরি হয় উদ্বেগ। তবে স্কালোনি সফল হয়েছেন মেসিকে দলের সবার ভরসার জায়গায় আনতে পেরে, দলের সবার ভেতর একটা ঐক্য তৈরি করে আর বাকি সবাইকে আশ্বস্ত করতে পেরেছেন তার পরিকল্পনার যথার্থতার ব্যাপারে। দে লা ফুয়েন্তে ছোটবেলা থেকেই স্প্যানিশ দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়কে চেনেন, অনেকেই তার অধীনে বয়সভিত্তিক দলগুলোতে খেলছে। মিকেল মেরিনো তো বলেছেনই যে ফুয়েন্তে তার বাসায় চলে যেতেন! কর্তৃত্বের বদলে অভিভাবকসুলভ দায়িত্বশীলতা নিয়েই স্পেনের তরুণ ফুটবলারদের আগলে রেখেছেন ফুয়েন্তে।
বিয়েলসার দর্শনের সঙ্গে নিজস্ব জীবনবোধের মিশ্রণ আর বাস্তব অভিজ্ঞতা মিশিয়েই সফল হয়েছেন স্কালোনি, দে লা ফুয়েন্তে; আর তাত্ত্বিক হয়েও কোচ হিসেবে ২০০৪ অলিম্পিকের সোনাই সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে রয়ে গেছে বিয়েলসার।




