বিস্ময়ের শতবর্ষী কাইজেলিয়া

ফুল খয়েরি রঙের। ফল লম্বাটে ও গোলাকার, কাঁচা অবস্থায় হালকা বাদামি।
সব গাছের গল্প এক রকম নয়। কোনোটি ছায়া দেয়, কোনোটি ফল দেয়, আবার কোনোটি শুধু বিস্ময় জাগিয়ে রেখে যায়। রংপুরের কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী দুটি কাইজেলিয়া গাছ তেমনই এক জীবন্ত ইতিহাস। কত প্রজন্মের ছাত্র-শিক্ষক এদের পাশ দিয়ে হেঁটে গেছেন, কত ঋতু বদলেছে, কত ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়েছে এরা। অথচ আজও এই বিরল গাছ দুটিকে ঘিরে কৌতূহলের শেষ নেই।
বাবার প্রেসে বই ছাপার কাজে প্রায়ই আসতেন শহরের প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক মুহম্মদ আলীম উদ্দীন। তার লেখা ‘রংপুর সংবর্তিকা’ বইটির প্রুফ দেখার সময় কাইজেলিয়া নিয়ে অংশটি চোখে পড়ে। তখনই বলেছিলাম, লেখার সঙ্গে যদি এই অদ্ভুত ফলের একটি ছবি যোগ করা যায়, পাঠক নিশ্চয়ই বিস্মিত হবেন। আমার সংগ্রহে থাকা ছবিটিই পরে বইটিতে প্রকাশিত হয়েছিল।
কাইজেলিয়া বাংলাদেশের অত্যন্ত বিরল একটি বৃক্ষ। রংপুরের কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাসে এখনো শতবর্ষী দুটি গাছ টিকে আছে। একটি কলেজ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পশ্চিম পাশে, অন্যটি কলেজ মসজিদের মূল ফটকের সামনে। বয়সের ভারে দুটিরই কাণ্ডে নানা জায়গায় গর্ত তৈরি হয়েছে। সেই ক্ষতচিহ্ন যেন সময়ের সাক্ষী। প্রবল ঝড় বা দমকা বাতাসে যেকোনো সময় গাছ দুটি ভেঙে পড়তে পারে— এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
কাইজেলিয়া সাধারণত ২০ থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর ফুল খয়েরি রঙের। ফল লম্বাটে ও গোলাকার, কাঁচা অবস্থায় হালকা বাদামি। একটি ফলের ওজন দুই থেকে তিন কেজিও হতে পারে। দেখতে অনেকটা মানুষের বাহুর মতো হওয়ায় একে অনেকে ‘শেলট্রি’ বলেও চেনেন। ফলটি কোনো অবস্থাতেই মানুষের খাওয়ার উপযোগী নয়। তবে লোকমুখে প্রচলিত আছে, একসময় এটি হাতির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আশ্চর্যের বিষয়, এত বড় ও ভারী ফল হলেও মানুষের মাথায় পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে— এমন খবর শোনা যায়নি।
শুধু অদ্ভুত আকৃতির ফলই নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও কাইজেলিয়া গুরুত্বপূর্ণ। লন্ডনের কিংস কলেজের একদল গবেষক দেখেছেন, গাছটির মূল ও বাকলের রসে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা ত্বকের ক্যানসারের একটি মারাত্মক ধরন ‘ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমা’র কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম। গাছটির উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Kigelia pinnata (বর্তমানে Kigelia africana নামটিও বহুল ব্যবহৃত)। এটি Bignoniaceae পরিবারের সদস্য।
দুই দশকেরও বেশি আগে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে কৃষি বনায়নে মাস্টার্স করার সময় আমার গবেষণার সহ-তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ফসল উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তার সঙ্গে কাইজেলিয়া নিয়ে কথা বলতেই তিনি কয়েকটি ফল সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে বলেন।
২০০৪ সালের ১১ ডিসেম্বর রংপুরের ছান্দসিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর উদ্যোগে কারমাইকেল কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সামনে দুটি এবং রংপুর সরকারি কলেজে আরও দুটি কাইজেলিয়ার চারা রোপণ করা হয়। এর মধ্যে কারমাইকেল কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সামনের একটি গাছে দুবার ফুল ও ফল এসেছে। কিন্তু রংপুরের অন্যত্র লাগানো গাছগুলোতে এখনো ফুল বা ফলের দেখা মেলেনি।
বাংলাদেশে কাইজেলিয়া গাছটি প্রথম শনাক্ত করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ট্যাক্সনমিস্ট এ টি এম নাদেরুজ্জামান। তার সেই শনাক্তকরণের মধ্য দিয়েই দেশের উদ্ভিদবৈচিত্র্যের ভাণ্ডারে যুক্ত হয় এক বিরল, বিস্ময়কর এবং গবেষণা সম্ভাবনাময় বৃক্ষের নাম— কাইজেলিয়া।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক




