সম্পাদকীয়
প্রশাসনিক দাদাগিরি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয়, দুর্যোগ মোকাবিলার চেয়ে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে যে টানাপড়েন তৈরি হয়, সেটিই অনেক সময় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্ভোগে পরিণত হয়। ফলে অনিশ্চয়তা, বিভ্রান্তি ও মানসিক চাপের বোঝা বহন করতে হয় লাখো পরীক্ষার্থীকে।
শিক্ষা বোর্ডগুলো আইন অনুযায়ী পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার ওপর প্রায়ই খড়্গ নেমে আসে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতে হয় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বোর্ডের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের তথ্যকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এতে প্রশাসনিক সমন্বয়ের বদলে ক্ষমতার দ্বন্দ্বই প্রকাশ পেয়ে যায়।
দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দ্রুত, বাস্তবসম্মত ও মানবিক সিদ্ধান্ত; কিন্তু যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয় কিংবা বারবার অবস্থান পরিবর্তন করা হয়, তখন শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ম্লান হয়ে পড়ে। পরীক্ষার তারিখ নিয়ে অনিশ্চয়তা, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীর কল্যাণ নিশ্চিত করা হলেও বাস্তবে তারা হয়ে ওঠে প্রশাসনিক টানাপড়েনের ভুক্তভোগী।
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের একটি আলটপকা মন্তব্যে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে রাজপথে নেমে পড়লে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তা শিক্ষার্থীসুলভ আচরণ ছিল না। দুর্যোগের কথা বলে পরীক্ষা পেছানোর সঙ্গে মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিও সংগত ছিল না। সড়কে যানজট সৃষ্টিকারী আচরণও ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। পরীক্ষা বাতিলের দাবিকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয় শিক্ষা েবার্ডের মধ্যে শুরু হয় টানাপড়েন। একপক্ষের মন্তব্য ছিল দুর্যোগে একটি-দুটি পরীক্ষা পেছালে কী এমন ক্ষতি হতো? আবার অন্য পক্ষের মন্তব্য ছিল— দাবির মুখে পরীক্ষা পেছানো হলে তা মামাবাড়ির অাবদারের মতো নিয়মে পরিণত হয়ে যাবে।
এ ধরনের পরিস্থিতি কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য কাম্য হতে পারে না। ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, দায়িত্বশীল সমন্বয়ই হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য। শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; তারা একই ব্যবস্থার অংশ। তাই দুর্যোগকালীন পরীক্ষা পরিচালনার জন্য আগে থেকেই একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা, নির্ধারিত দায়িত্ব বণ্টন এবং জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। কোন পরিস্থিতিতে কে সিদ্ধান্ত নেবে, কত সময়ের মধ্যে জানানো হবে এবং কীভাবে তা জনসাধারণের কাছে পৌঁছাবে— এসব বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা থাকতে হবে।
আমরা একটি উদাহরণ তুলে ধরতে পারি, ব্রিটিশ আমলের একটি অর্ডিন্যান্স ২০২১ সালে সংশোধন করা হয়। সেই সংশোধিত আইনে পরীক্ষা ছাড়া মূল্যায়ন বা অটোপাস দেওয়া সম্ভব। অর্ডিন্যান্সের ধারা ২, সাব-সেকশন (২-এ)-তে বলা হয়েছে— মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরকারের দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে ইন্টারমিডিয়েট ও সেকেন্ডারি পর্যায়ের বা এর যেকোনো পর্যায়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করা সম্ভব না হলে সেই পরীক্ষা স্থগিত করা যাবে। শুধু তাই নয়, পরীক্ষা ছাড়াই মূল্যায়ন এবং সনদ দেওয়া যাবে কিংবা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। যেখানে আইনে এমন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ রয়েছে, তা অনুসরণ করা যেত। সেদিকে না গিয়ে একটা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতায় প্রশাসনিক ‘দাদাগিরি’ প্রকাশ পায়।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ধরনের প্রশাসনিক অহমিকা বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব গ্রহণযোগ্য নয়। দুর্যোগ সাময়িক; কিন্তু ভুল সিদ্ধান্তের ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি, সমন্বয় ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।




