আলোচনার আগেই কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে উন্নতি চায় ইইউ
- কিছু কার্গো পড়ে আছে ১২ বছর
- রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হয় পণ্যমান, হারায় শনাক্তকরণ ট্যাগ
- সমস্যা মেটাতে ৮ সদস্যের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে আলোচনা শুরুর জন্য সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। জবাবে ইইউ জানিয়েছে, বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং সমস্যাসহ নানা সমস্যার কথা। যেগুলোর দৃশ্যমান সমাধান হলেই আলোচনা এগোতে পারে— বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে ইইউ। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৫ জুন বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে বসেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সেখানেই উঠে আসে কার্গো হ্যান্ডলিং নিয়ে জটিলতার বিষয়গুলো।
কার্গো হ্যান্ডলিং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা অনেক দিন ধরেই করছে বাংলাদেশ। ২০ বছর আগে এ সমস্যা মেটানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। চেষ্টা করেছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান ফখরুদ্দীন আহমদও। এ সমস্যা সমাধানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাঠে নামিয়েছিলেন সচিব-মুখ্য সচিব থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যন্ত। একের পর এক কমিটি, সুপারিশ; কিন্তু অগ্রগতি হয়নি কিছুই। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং যে তিমিরে ছিল, সেখানেই আছে। বর্তমান সরকারও একই সমস্যা সমাধানে পথে নেমেছে। বলা যায়, সমাধানের পথ বের করতে বাধ্য হচ্ছে।
হাজার মাইল পেরিয়ে বিপুল ব্যয়ে দেশে আসে বিভিন্ন পণ্যবোঝাই কার্গো। অথচ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসব পণ্যের স্থান হয় খোলা আকাশের নিচে। বৃষ্টি ও রোদে নষ্ট হয় পণ্যের মান, হারিয়ে যায় শনাক্তকরণ ট্যাগ। বিশ্বে শাহজালালই একমাত্র বিমানবন্দর, যেখানে অবহেলায় পড়ে থাকে লাখো কোটি টাকার মালপত্র।
মন্ত্রীর সঙ্গে সেই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের ভেতরে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিমানবন্দরের বাইরে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ স্থাপনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ১ লাখ বর্গফুটের অস্থায়ী ওয়্যারহাউজ নির্মাণে জায়গা চিহ্নিত করতে ওই বৈঠকেই নতুন কমিটি গঠন করা হয়। বৈঠকে উঠে আসে নানা সমস্যার কথা। যার অন্যতম হলো আগুন। গত বছরের ১৮ অক্টোবরের আগুনে আমদানি টার্মিনালের দুটি শেড মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চারটি গুদামের মধ্যে একটি পুরোপুরি পুড়ে যায় এবং আরেকটি আংশিক। এরপর ২০২৬ সালের ৫ জুন আবারও অগুন লাগে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তোলে। এসব ঘটনার পর ছয়-সাতটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও বাস্তবায়নে অগ্রগতি সীমিত। অগ্নিকাণ্ড-পরবর্তী বিভিন্ন সভায় নেওয়া ১১টি সিদ্ধান্তের মধ্যে মাত্র দুটি বাস্তবায়িত হয়েছে। যদিও কার্গো হ্যান্ডলিং সচল রাখতে কুরিয়ার, ওষুধ এবং ডেঞ্জারাস গুডস সংরক্ষণের জন্য অস্থায়ী ব্যবস্থাও করা হয়েছে, তবুও তা স্থায়ী সমাধান নয়। ২৫ জুনের বৈঠকের কার্যবিবরণী পরের সপ্তাহে পাঠানো হয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। সেখানে বলা হয়, অগ্নিকাণ্ডের পর সাময়িক ব্যবস্থায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও সংকট কাটেনি। প্রায় ২ হাজার ৭০০ টন কার্গোপণ্য খালাস করা হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ৩০০ টন পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এমনকি ৯ নম্বর গেটে অখালাসকৃত ১ হাজার ৩৮৫ টন পণ্য দ্রুত রিলিজের সিদ্ধান্ত থাকলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
শাহজালালে কার্গোজটের শুরু ১৯৮৫ সালে। কার্গো টার্মিনালের কার্যক্রম শুরুর পর প্রথম দেড় দশক বিমানবন্দরে আমদানি পণ্য ছিল তুলনামূলক কম। তবে ২০০২-০৩ সাল থেকে কার্গো ফ্লাইট চালু হওয়ার পর আমদানি পণ্যের পরিমাণ হঠাৎ চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। কিন্তু সেই অনুপাতে কার্গো গুদামের সম্প্রসারণ বা বিকল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি, যার প্রভাব আজকের দীর্ঘমেয়াদি জটের অন্যতম মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি কোনো কোনো পণ্য ১০-১২ বছর পর্যন্ত টার্মিনালে পড়ে থাকার নজির রয়েছে। বৈঠকে কাস্টম কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় ৯০ শতাংশ বিল অব এন্ট্রি জমার দিনেই মূল্যায়ন হয় এবং শুল্ক পরিশোধ করলে সেদিনই পণ্য খালাস সম্ভব। তবে ২১ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস না হলে নিলামে দেওয়ার বিধান থাকলেও নিলাম প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় বিপুল পণ্য জমে থাকে। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নিলামযোগ্য (ইনভেন্টরি করা) অখালাস করা মালামালের পরিমাণ ছিল মোট ৩৫৯ টন— যার মধ্যে ২০১১ সালে ৫৭, ২০১২ সালে ১৩৫, ২০১৩ সালে ২৩, ২০১৪ সালে ৩০, ২০১৫ সালে ২৫ ও ২০১৬ সালে ৮৯ টন।
এ তথ্যই প্রমাণ করে, খালাস না হওয়া পণ্য জমে থাকার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। এ কারণে আলাদা নিলাম নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ওষুধ আমদানি-রপ্তানি ত্বরান্বিত করতে কোল্ড স্টোরেজ অবকাঠামো ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মডেল অনুসরণ করে সাত দিনের মধ্যে এসওপি চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কার্গোজট নিরসনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে ছুটির দিনেও পূর্ণোদ্যমে পণ্য খালাস কার্যক্রম চালু রাখা, ব্যাংক খোলা রাখা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে কার্গো ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, যাতে দ্রুত আমদানিকারকদের কাছে নোটিস পাঠানো এবং পণ্য শনাক্ত করা যায়।
এ ছাড়া সমস্যা সমাধানে আট সদস্যের একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠন করা হয়েছে, যা প্রতি মাসে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কাছে প্রতিবেদন দেবে। অন্যদিকে, র্যাবের বরাদ্দ করা জমির অতিরিক্ত অংশ ফিরিয়ে এনে সেখানে ওয়্যারহাউজ নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এসব বিষয়ে কথা হয় এভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহেদুল আলমের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিমানবন্দরের কার্গো সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার ফল। কার্গো ভলিউম বাড়লেও সে অনুযায়ী অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন হয়নি। বারবার কমিটি ও নির্দেশনা এলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকায় সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়নি। স্থায়ী সমাধানের জন্য বিমানবন্দরের বাইরে আধুনিক ওয়্যারহাউজ, সমন্বিত লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জরুরি।’




