সোয়া লাখ কোটি টাকার রাজস্ব একাই দেয় চট্টগ্রাম
- ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে
- ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব এসেছে চট্টগ্রাম থেকে
- অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ২৭ শতাংশই এসেছে চট্টগ্রাম থেকে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এক বছরে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জোগান দিয়েছে চট্টগ্রাম। তাও আবার এককভাবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন চারটি খাত কাস্টমস, ভ্যাট, আয়কর ও বন্ড থেকে এই বিপুল রাজস্ব জমার খবর মিলেছে। প্রতি বছরই চট্টগ্রাম থেকে রাজস্ব আয়ের বড় জোগান দেওয়া হয়, যা পুরো দেশের উন্নয়ন-অবকাঠামো খাতে ব্যয় করে সরকার।
সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা দেশ থেকে এনবিআর ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করেছে বলে সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৮১ শতাংশ। চট্টগ্রাম কত রাজস্ব দেয়, তা পৃথকভাবে হিসাব রাখে না এনবিআর।
তবে আগামীর সময়ের নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মোট রাজস্ব আয়ের মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকেই সরকারি কোষাগারে এবার জমা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। সহজ কথায়, দেশের মোট অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের ২৭ শতাংশ একাই জোগান দিচ্ছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। আরও সহজ করে বললে, দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে চট্টগ্রাম থেকে। দেশের মধ্যে আর কোনো জেলার এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব দেওয়ার নজির নেই। দেশের প্রধান সামুদ্রিক বন্দর চট্টগ্রামে বলেই রাজস্ব আহরণের মাত্রা বেশি এখানে।
চট্টগ্রাম থেকে যে এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়, সেটি শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান। তিনি বললেন, ‘এত রাজস্ব দেওয়ার পরে চট্টগ্রাম কী পায়? চট্টগ্রাম যে বঞ্চিত হচ্ছে সেসব তুলে ধরেন আপনারা (সাংবাদিক)। ৪০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা শিল্পপতিকে ইন্সপেক্টর লেভেলের একজন সরকারি কর্মকর্তা এসে অকারণে যন্ত্রণা দেন, তিনি তো মনোবল হারাবেন।’
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলছেন, ‘যেখানে অর্থনীতি আকার বাড়ছে, উৎপাদন বাড়ছে, কর্মসংস্থান হচ্ছে, রাজস্ব আসছে, সেখানে নজর না বাড়ালে ভবিষ্যতে বিপদে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। ১২ বছর আগে থেকে বে-টার্মিনাল নির্মাণের সাইনবোর্ড ঝুলছে, আলোর মুখ দেখেনি। মিরসরাই ইকোনমিক জোন বানিয়েছে পানির নিশ্চয়তা ছাড়া। পায়রা বন্দরে দ্রুত বিনিয়োগ করতে পারে কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে স্ক্যানার কিনতেই বছরের পর বছর লেগে যায়। চট্টগ্রামকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন বা অ্যাড্রেস না করেও সৌভাগ্যবশত ১ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পেয়ে যাচ্ছে সরকার।’
ব্যবসায়ী নেতারা জানালেন, বন্দরের সেবা আরও গতিশীল করা, সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখতে চট্টগ্রাম-ঢাকা ডেডিকেটেড মহাসড়ক তৈরি করা, চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টকে পুরোপুরি ফাংশনাল করা, কস্ট অব ডুইং বিজেনস কমানো, ডিজিটালাইজড বন্দর করার মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে রাজস্ব জোগান কোন পর্যায়ে পৌঁছবে কল্পনাও করতে পারবে না সরকার।
অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ সিকান্দার খানের মতে, ‘উন্নয়ন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নীতি হলো— যে অঞ্চল থেকে বেশি রাজস্ব আসবে, তার একটি নির্দিষ্ট অংশ সেই অঞ্চলের অবকাঠামো ধরে রাখার জন্য আবার বিনিয়োগ করতে হবে। চট্টগ্রাম শুধু একটি শহর নয়, এটি দেশের অর্থনীতির ইঞ্জিন। আপনি যদি ইঞ্জিনে নিয়মিত মবিল বা জ্বালানি না দেন, তবে পুরো ট্রেন একসময় থমকে যাবে। চট্টগ্রামকে সঠিকভাবে নার্সিং করতে না পারলে ট্রেনের দশা হবে।’
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
এখন প্রশ্ন এই বিপুল রাজস্ব কোত্থেকে আসে। দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারজাত পণ্যের ৯৮ শতাংশ পরিবাহিত হয় দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে। আমদানি-রপ্তানির সব অনুমোদন প্রক্রিয়া হয় চট্টগ্রাম কাস্টমসে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে এবার সাড়ে ৮১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব এসেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি।
শুধু তাই নয়, এনবিআর এবার কাস্টমস খাতে ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ একাই দিয়েছে সাড়ে ৮১ হাজার কোটি টাকা।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, কালুরঘাট ও নাসিরাবাদ শিল্পাঞ্চল দেশের ভারী শিল্পের মূল চালিকাশক্তি। বিশেষ করে বিএসআরএম, পিএইচপি, আবুল খায়ের, কেডিএস, কেএসআরএম, জিপিএইচ ইস্পাত, টিকে গ্রুপের মতো ভারী শিল্পকারখানা, সিমেন্ট কারখানা, পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা, জাহাজ ভাঙা (শিপব্রেকিং) শিল্প এবং দেশের সবচেয়ে বড় ইপিজেড এই অঞ্চলেই অবস্থিত। স্থানীয় পর্যায়ে এই উৎপাদনশীল খাতগুলো থেকে প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট আদায় করে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগ।
চট্টগ্রামের বড় শিল্পগ্রুপ, শীর্ষ ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার কাছ থেকে সাতটি কর অঞ্চল থেকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার আয়কর রাজস্ব বোর্ডে জমা পড়ে। বন্ডসহ কনটেইনার ডিপো থেকে আরও ২ হাজার কোটি টাকা আয় করে রাজস্ব বোর্ড। সব মিলিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জমা দেয় চট্টগ্রাম। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দর আয় করে ৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব।
কাস্টমস, আয়কর বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, প্রতি বছর চট্টগ্রাম থেকে রাজস্ব আয়ের হার ৮-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম থেকে ৯৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জোগান দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার কোটি টাকা। শুধু সেবা খাতকে যদি উন্নত করা যায়, তাহলে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ অনেক বাড়বে।




