শুভ জন্মদিন বুলবুল চৌধুরী
চুপচাপ অথচ নিরলস এক কথাকার

বুলবুল চৌধুরী (১৬ আগস্ট, ১৯৪৮-- ২৮ আগস্ট, ২০২১)। গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
আজ ১৬ আগস্ট, কথাসাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরীর জন্মদিন। ১৯৪৮ সালের এই দিনে গাজীপুরের দক্ষিণবাগ গ্রামে তার জন্ম। বেঁচে থাকলে বয়স হত ৭৭। কিন্তু তিনি নেই, কী করা যাবে! ২০২১ সালের ২৮ আগস্ট পৃথিবীর জঞ্জাল থেকে নিজেকে মুক্ত করেছেন। অথচ তার সৃষ্টির জগৎ আজও চমৎকৃত করে চলেছে তার তন্বিষ্ট্য পাঠকদের। বাংলা কথাসাহিত্যের এক নিবিড় পাহারাদার ষাটের দশকে আবির্ভূত হওয়া এই সৃজনশীল কথাশিল্পী।
বুলবুল চৌধুরীর সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘টুকা কাহিনী’ দিয়ে। সদ্যস্বাধীন দেশে প্রকাশিত এই গল্পটি ছিল এক নতুন বিস্ময়। তিনি দেখালেন, গ্রামীণ জীবনের টানাপোড়েন, মানুষের আঁকাবাঁকা মনস্তত্ত্ব, প্রকৃতির রূপ— সবই হতে পারে গভীর সাহিত্যের উপাদান। তার ভাষা ছিল নতুন, সতেজ, কাব্যিক। তিনি বাউল-স্বভাবী, কিন্তু তার গদ্যে জ্যামিতিক পরিপাটি ছন্দ। লিখেছেন গ্রামের কথা, নগরের কথা, মানুষের কথা।
প্রথম গ্রন্থ ‘টুকা কাহিনী’ তাকে এনে দিয়েছিল খ্যাতি। তারপর তিনি থামেননি। ‘পরমানুষ’, ‘মাছের রাত’, ‘চৈতার বউ গো’— একটার পর একটা গল্পগ্রন্থ। উপন্যাসের তালিকাও দীর্ঘ : ‘অপরূপ বিল ঝিল নদী’, ‘কহকামিনী’, ‘তিয়াসের লেখন’, ‘অচিনে আঁচড়ি’, ‘মরম বাখানি’, ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’, ‘ইতু বৌদির ঘর’, ‘দখিনা বাও’। আত্মজীবনী লিখেছেন ‘জীবনের আঁকিবুঁকি’ ও ‘অতলের কথকতা’ নামে। কিশোরদের জন্য লিখেছেন ‘গাঁওগেরামের গল্পগাথা’, ‘নেজাম ডাকাতের পালা’, ‘ভালো ভূত’ আর ‘প্রাচীন গীতিকার গল্প’। সাহিত্যের এমন বহুমুখী চর্চা নিকট সময়কালে একটু বিরলই।
দুই চাকায় চর ভ্রমণ
১৬ আগস্ট ২০২৬
তার গল্পের প্রধান উপজীব্য প্রকৃতি ও মানুষ। বাংলার বর্ষা, নদী, মাঠ, মাছ ধরা— এসব তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে নিখুঁত বর্ণনায়। তিনি নিজে জেলে না হলেও তার বর্ণনায় মনে হয় জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরেছেন।
‘মাছের রাত’ গল্পে দাদা ছোমেদ আলী ও নাতি নছরের রাতভর মাছ ধরার অভিযান— এ যেন চলচ্চিত্রের দৃশ্য। প্রকৃতির বর্ণনায় তিনি ছিলেন চিত্রশিল্পী। তবে তার ক্যানভাস জুড়ে ছিল মানুষ আর মানুষ— অভাবী, অসহায়, প্রান্তিক মানুষ। টুকা চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যে এক বিস্ময়। কদাকার চেহারার এই ছেলেটির ভেতরে ভালোবাসা, ক্রোধ, অনুশোচনা— সবই আছে। ‘ওই তব ভোর’ গল্পের সিঁধেল চোর কালা কান্দু মৃত্যুপথযাত্রী বুড়িকে দেখে নিজের দাদীর কথা মনে করে; চুরি ভুলে যায়, সেবা করে। এ এক অসামান্য মানবিকতার প্রকাশ। তার গল্পে খুনি কিরমিনও শেষ পর্যন্ত ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়।
বুলবুল চৌধুরী বিশ্বাস করতেন মানুষের ভেতরের ভালোটার ওপর। তাই তার কলমে খলনায়করাও রূপান্তরিত হয়। তার ভাষা সরল, কিন্তু গভীর। তিনি কঠিন করে লেখেননি। অথচ তার গল্পে দর্শন আছে, রহস্য আছে, কবিতা আছে। তিনি পাঠকের কল্পনাকে সম্মান করতেন, দু’চার বার দেখা আড্ডায়ও তার যে কণ্ঠনিঃসৃত কথাগুলো মনে আছে, তার মধ্যে ‘পাঠকরে সম্মান করতে হবে মিঞা’, এখনো কানে বাজে।
বুলবুল চৌধুরীর কিছু কিছু গল্প শেষ হত না, থেকে যেত অসমাপ্ত— জীবনের মতোই। যেমন ‘মাছ’ গল্পে সিরাজ আবিষ্কার করে ইদ্রিস তাকে একা ফেলে পালাচ্ছে। কেন? উত্তর নেই। কিন্তু এই না-থাকাই জীবনের সত্য। সমালোচকেরা হয়তো বলেন, কিছু গল্প দুর্বল। কিন্তু ‘টুকা কাহিনী’, ‘সংসার’, ‘অচেনা নদীতে ঢেউ’, ‘নান্দিবিনাশ’, ‘লক্ষ্মীছায়ার গল্প’— এগুলো বাংলা ছোটগল্পের সম্পদ। বিশেষত ‘টুকা কাহিনী’— একটি গল্পই তাকে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট।
তার সাহিত্যিক জীবনের স্বীকৃতি এসেছে অনেক দেরিতে।
হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জসীমউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার এবং সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক সবই পেয়েছেন। অথচ জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি ছিলেন নিঃস্ব। ক্যানসার নামের নিষ্ঠুর রোগ তার থেকে কেড়ে নিতে চাচ্ছিল সবকিছু। শ্বাসযন্ত্রে ক্যানসার ধরা পড়ার পর তার জমানো প্রায় ত্রিশ লাখ টাকা চিকিৎসায় শেষ হয়ে যায়। হাতে আর কিছুই ছিল না। তবু তিনি লড়েছেন। নিঃশব্দে, একাকী। কাউকে সেভাবে বোধহয় বলেননি। ২০২১ সালে একুশে পদক পাওয়ার আনন্দও ম্লান হয়ে গিয়েছিল অসুখের ছায়ায়। ২৮ আগস্ট তিনি পৃথিবীর জঞ্জাল থেকে নিজেকে মুক্ত করলেন। অথচ পৃথিবী যেমন ছিল, তেমনই রইল। কোথাও কোনো পরিবর্তন নেই।
আমরা কেবল স্মরণ করতে পারি তার অমর সৃষ্টিগুলো। টুকা, কালা কান্দু, ছায়রা, নছর, কিরমিন— তারা বেঁচে থাকবে বাংলা সাহিত্যের পাতায় পাতায়। তার গ্রামবাংলার বর্ণনা, নদীর জোয়ার, বর্ষার বৃষ্টি, মাছ ধরার রাত— এসব আমাদের সংস্কৃতির এক নিখুঁত পরিবেশনা। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাকে পড়বে। তার ভাষায়, তার গল্পে খুঁজে পাবে জীবনের অর্থ।
বুলবুল চৌধুরী ছিলেন নিঃশব্দে কাজ করে যাওয়া এক নিরলস কথাশিল্পী। তিনি প্রচার চাননি, চেয়েছিলেন শুধু লিখতে আর আড্ডা মারতে। আজকের কোলাহলমুখর সময়ে তার মতো নিভৃতচারী লেখক আর কই?












