দুই চাকায় চর ভ্রমণ

ছবি: নওশাদ নওয়াজ
দুদিন আগে ঢাকা থেকে আমরা পাঁচজন প্রথমে লঞ্চযোগে, এরপর সাইকেলের চাকায় ভর করে এবং শেষ ধাপে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে চর কুকরিমুকরি এসে পৌঁছেছি। আজ ঈদ। এখানে ঈদের তেমন কোনো আয়োজন নেই। কাউকে পশু কোরবানি দিতে দেখিনি। কাউকে নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়াতেও দেখছি না। নওশাদ অবশ্য ঢাকা থেকে আনা পাঞ্জাবি পরে ঈদের নামাজ পড়তে গিয়েছে। অন্যরা বসে পরিকল্পনা করছি, কোথায় যাওয়া যায়। গুগল ম্যাপ দেখে ঠিক হলো, আজ আমরা ঢালচরে যাব। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ডাকাতিয়া নামক জায়গায় গিয়ে একটি ট্রলার ভাড়া করলাম। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে।
ট্রলার ছোট খাল পেরিয়ে নদী ও সাগরের মোহনায় পড়ল। মাঝি এবং মাঝির সহকারী যাত্রাপথের নারিকেল বাগান দেখান। আরও জানান, পর্যটকরা যারা চর কুকরিমুকরিতে ক্যাম্পিং করতে চান, তারা এই নারিকেল বাগান বেছে নেন। বৃষ্টির তীব্রতা বাড়লে ব্যাগগুলো ছইয়ের মধ্যে রেখে আমরা ট্রলারের ছাদে বৃষ্টিতে ভিজি।
ঘণ্টাখানেক ট্রলারযাত্রা শেষ করে ঢালচরের তাড়ুয়া বিচে পৌঁছাই। বিচের কাছে পানি কম থাকায় ট্রলার এগোতে পারে না। আমরা পানির মধ্যেই নেমে যাই। সাইকেলগুলো কাঁধে নিয়ে হাঁটুপানি পেরিয়ে তাড়ুয়া বিচে নেমে ভীষণ আনন্দিত হই। সাদা বালুর মধ্যে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি; আমাদের দেখলেই গর্তে লুকাচ্ছে।
সমুদ্রের সমান্তরালে, এক সারিতে সাইকেল চালাই আমরা। চরের ইট বিছানো রাস্তা ধরে এগিয়ে যাই। বেশিরভাগ জায়গাতেই রাস্তা ভেঙে গিয়েছে। চর প্রতিনিয়তই ভাঙছে, রাস্তাগুলো তাই মেরামত করেও তেমন লাভ হয় না। কিলো পাঁচেক চালিয়ে একটি বাজারে পৌঁছালাম। বেশিরভাগ দোকান বন্ধ। দোকান-লাগোয়া ঘরে সবাই থাকেন বলে মনে হলো। গোটা পঞ্চাশেক পরিবারের বাস এখানে। তাদেরই একটি বেলাল পরিবার।
নদীভাঙনের মতো বেলাল ভাইয়ের শরীর ভেঙে পড়ছে, ঠিক ঘরের কাঠামোটির মতো হাড় জিরজিরে স্বাস্থ্য। তিনি ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। আমরা বেলাল ভাইয়ের হোটেলে দুপুরের খাবারের জন্য অপেক্ষা করি। দোকানে দুটো মাত্র টেবিল; ওপরে শামিয়ানা টাঙানো, ভেতরের দিকে বেলাল ভাই তার পরিবার নিয়ে থাকেন। আজ ঈদ, বেলাল ভাইয়ের ঘরে সামান্য মাংস আছে, তাই আমাদের জন্য রেঁধে দেন।
খাওয়া শেষ করে ঢালচরে বেড়াতে বের হই। বেলাল ভাইয়ের দোকান থেকে সামনে একটু এগোলেই ম্যানগ্রোভ বন। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি, কাদামাটি ও জলাবদ্ধ পরিবেশের এই বন আমাদের বেশ ভালো লাগে। বনের মধ্যে ঘোরা শেষ করে আমরা এবার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। ছোট্ট চরটি ঘুরে দেখব আর আগামীকালের জন্য লঞ্চের খোঁজখবর নেব। আসার পথে নদীর বাঁকে সূর্যাস্তের ছায়া পড়ে।
লঞ্চঘাটে বসে সূর্যাস্ত উপভোগ করি। পাশেই একটি বাজার। সেখানকার স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে আমরা চর মন্তাজ যাব। ঘাট পেরিয়ে চরের অন্য অংশে যাই, সেখানে একটি বিদ্যালয় পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখতে পাই। নদীর কাছাকাছি পৌঁছালে বুঝতে পারি, আগে এখানে মানুষের আবাস ছিল; কিন্তু নদীভাঙনে পরিবারগুলোকে অন্য কোথাও চলে যেতে হয়েছে।
সিদ্ধান্ত হলো, আমি আর এপি আপু বেলাল ভাইয়ের বাড়িতে থাকব আর ছেলেরা ঘরের বাইরে তাঁবু টাঙিয়ে থাকব। রাত্তিরে বেলাল ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হয়। তখন মনে পড়ে, দিনের বেলা চরে কোনো নারীকে দেখতে পাইনি। হঠাৎ যেন মনে হবে এই এলাকা নারীবর্জিত। বেলাল ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে বেশ গল্প হয়। দুপুরের খাবার তিনি রেঁধেছেন, রাতেও রাঁধবেন। বাইরে একটি টিউবওয়েল আছে। রাত গভীর হলে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন এখানকার নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। সারা দিনের কাজকর্ম ও গোসলের জন্য টিউবওয়েল থেকে পানি নিয়ে ঘরে আসেন।
বাংলাদেশের মানচিত্রের একেবারে দক্ষিণে সাগরের বুকে বিন্দুর মতো জেগে থাকা চরগুলোর সৌন্দর্য, চরের মানুষের জীবন-সংগ্রাম, তাদের সারল্য, আতিথেয়তা আর দেশ দেখার গাঢ় অনুভূতি নিয়ে আমরা ফিরে আসি।
যেভাবে যাবেন: ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে করে ভোলার ঘোষেরহাট বা বেতুয়াঘাটে নেমে সেখান থেকে চর কচ্ছপিয়া ঘাট হয়ে ট্রলারে চর কুকরিমুকরি যেতে হবে।






