চকলেট খেলে কি ওজন বাড়ে?

সংগৃহীত ছবি
দুঃখের দিনে মন ভালো করা, কিংবা খুশির দিনে মুখ মিষ্টি করা— সব কিছুতেই চকলেটের জুড়ি মেলা ভার। প্রিয়জনকে ভালোবাসার কথা জানাতে বা নিজের মনকে ভালো করতে আমরা চকলেট বেছে নিই। আট থেকে আশি, সব বয়সীদের কাছেই এখন অন্যতম প্রিয় এক খাবারের নাম চকলেট।
আজ ৭ জুলাই, বিশ্ব চকলেট দিবস। যদিও চকলেটের নাম শুনলে এখনো অনেকেই বলে থাকেন, এত বেশি চকলেট খেয়ো না, ওজন বেড়ে যাবে। বেশি চকলেট খেলে দাঁত নষ্ট হবে। ক্যালোরি বেড়ে যাবে হু হু করে ইত্যাদি। তারা নিশ্চয়ই আপনার ভালোর জন্যই এমনটা বলে থাকেন। কিন্তু এসব পরামর্শ কতটা কার্যকরী?
আজকের এই বিশেষ দিনটিতে চকলেট নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করতেই কিছু চমকপ্রদ তথ্য জানতে পারলাম। কিছু প্রশ্ন যেগুলো হয়তো কখনো না কখনো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে, যেমন দুনিয়ার কোন দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি চকলেট খায়? কিংবা কোন দেশে চকলেট সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়? আবার চকলেট কি সত্যিই আপনার ওজন বাড়িয়ে দিতে পারে? নাকি ওজন কমাতে সাহায্য করে?
চলুন জেনে নিই তাহলে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো।
চকলেট সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় কোথায়?
চকলেট তৈরির মূল উপাদান ‘কোকো বিন’ আফ্রিকা মহাদেশে বেশি চাষ হলেও, আসল সুস্বাদু চকলেট বানানোর কারখানায় চ্যাম্পিয়ন কিন্তু ইউরোপের দেশগুলো। সারা দুনিয়ায় যত চকলেট বিক্রি হয়, তার বড় একটা অংশ একাই তৈরি করে জার্মানি। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চকলেট উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশ জার্মানি। বেলজিয়ামের চকলেট স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। দামি এবং প্রিমিয়াম চকলেট বানানোর জন্য বেলজিয়াম পুরো বিশ্বে বিখ্যাত।
চকলেট খাওয়ার ওস্তাদ কারা?
সারা বিশ্বে যত চকোলেট বিক্রি হয়, তার প্রায় অর্ধেক মানে প্রায় ৪৫% একাই খেয়ে শেষ করে ইউরোপের মানুষ। শুধু বানানোই নয়, খাওয়ার দিক থেকেও জার্মানরা সবার আগে। এখানে একজন মানুষ বছরে গড়ে ৮ কেজিরও বেশি চকলেট খায়!
চকলেটের জন্য বিখ্যাত সুইজারল্যান্ড। এই দেশের মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ৭ থেকে ৯ কেজি চকলেট পেটে পুরে। ব্রিটিশরাও চকলেট ছাড়তে পারে না। যুক্তরাজ্যের মানুষরা বছরে গড়ে প্রায় ৭ কেজি চকলেট খায়।
চকলেট খেয়ে মোটা হচ্ছে কোন দেশ?
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সুইজারল্যান্ডের মানুষ এত চকলেট খেয়েও কিন্তু মোটা হয় না! কারণ তারা চকলেটের নামে চিনি বা চর্বি খায় না, তারা খায় খাঁটি ডার্ক চকলেট, যা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। উপরন্তু তারা প্রচুর হাঁটাচলা ও সাইকেল চালায়।
তাহলে মোটা হচ্ছে কারা? আমেরিকার মানুষ ইউরোপের চেয়ে চকলেট কিছুটা কম খেলেও, তারা প্রচুর পরিমাণে চিনিযুক্ত মিল্ক চকলেট, চকলেট সিরাপ এবং ফাস্টফুড খায়। অলস জীবনযাপন আর এই ভুল চকলেট খাওয়ার অভ্যাসে আমেরিকার মানুষ দিন দিন অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাচ্ছে।
ব্রিটিশদের মধ্যেও ইদানীং কায়িক পরিশ্রম না করার অলসতা দেখা দিয়েছে। সেইসঙ্গে অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত মিষ্টি চকলেট খাওয়ার কারণে সেখানেও স্থূলতা বা মোটা মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
যদি প্রশ্ন আসে— চকলেট কি সত্যিই আপনার ওজন বাড়িয়ে দিতে পারে? সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, হ্যাঁ। অন্য যেকোনো উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবারের মতোই চকলেটও আপনাকে মোটা করে তুলতে পারে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চকলেট খাওয়ার পরিমিতি জানতে হবে এবং সঠিক চকলেটটি বেছে নিতে হবে।
তবে কি আপনার চকলেট খাওয়া এড়ানো উচিত? এক্ষেত্রে বলা যায়, যদিও চকলেট ক্যালোরিযুক্ত থাকে তবে এর অর্থ এই নয় যে এটি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া উচিত। চকলেটের একটি বা দুটি টুকরা অনেক উপায়ে সহায়তা করতে পারে।
চকলেট স্ট্রেসের কারণে ওজন বৃদ্ধি কমাতে সহায়তা করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে আরও বেশি শরীরচর্চা করতেও অনুপ্রাণিত করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, ডার্ক চকলেট গ্রহণ সামগ্রিক বডি মাস ইনডেক্স হ্রাস করতে সহায়তা করে। এর কারণ অন্যান্য জাতের চকলেটের তুলনায় ডার্ক চকলেটে চিনি কম থাকে। কিছু ক্ষেত্রে, এটি আপনার চকলেটের প্রতি আকর্ষণ কমিয়ে আনতে পারে।
স্নায়ুবিজ্ঞানী উইল ক্লোয়ারের মতে, খাবার খাওয়ার ২০ মিনিট আগে চকলেটের একটি ছোট টুকরো খেলে তা পেট ভরিয়ে রাখার অনুভূতি দেয়। এতে আপনার খাবার খাওয়ার পরিমাণ কমে যায়।
কমপক্ষে ৭০ শতাংশ কোকোসহ ডার্ক চকলেট আপনার বিপাক বাড়াতে, ইনসুলিন স্পাইক প্রতিরোধ করতে এবং আপনাকে তৃপ্তি বোধ করতে সাহায্য করতে পারে। যা আপনাকে ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে।
ওজন কমানোর ডায়েটে চকলেট পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে পরিমাণের দিকে কড়া নজর রাখা জরুরি। উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত এই খাবারটি ক্ষুধা মেটাতে সাহায্য করলেও অতিরিক্ত চিনি রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, প্রতিদিন পুরো বারের পরিবর্তে মাত্র ১-২ টুকরো কম চিনিযুক্ত ডার্ক চকলেট খাওয়া উচিত।
চকলেট দিবসের মূল বার্তা হলো, চকলেট খেলেই মানুষ মোটা হয় না। যদি আপনি অতিরিক্ত চিনি ও মিল্ক চকলেট খান এবং কোনো হাঁটাচলা না করেন, তবেই ওজন বাড়বে।
তাই ওজন ঠিক রাখতে চাইলে ইউরোপের সুইজারল্যান্ডের মতো ডার্ক চকলেট খাওয়ার অভ্যাস করাটাই হতে পারে বুদ্ধিমানের কাজ।
সবাইকে বিশ্ব চকলেট দিবসের শুভেচ্ছা!





