ভ্যাপসা গরমে যে ৯ স্বাস্থ্য সমস্যা বেশি ভয়ংকর হয়

সংগৃহীত ছবি
আষাঢ়ের চড়া রোদ আর ভ্যাপসা গরমে জনজীবন ওষ্ঠাগত। এই তীব্র ও অস্বস্তিকর গরমে সুস্থ মানুষেরই যেখানে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়, সেখানে যাদের আগে থেকেই কিছু ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী রোগ রয়েছে, তাদের জন্য এই আবহাওয়া কিন্তু মোটেও হেলাফেলা করার মতো নয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত গরম ও বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা ভ্যাপসা ভাব নির্দিষ্ট কিছু রোগের লক্ষণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা অনেক সময় স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো জীবন সংশয়কারী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, গরমের সময় আমাদের হার্ট, কিডনি ও ফুসফুসের মতো অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোকে শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, এই তীব্র গরমে কোন ৯টি শারীরিক সমস্যায় আক্রান্তদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে এবং কীভাবে সুস্থ থাকবেন।
১. হার্ট অ্যাটাক ও হৃদরোগ
অতিরিক্ত গরমে শরীর থেকে ঘাম ঝরানোর জন্য এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হার্টকে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত ও জোরে পাম্প করতে হয়। যাদের হার্টের ধমনীতে ব্লক রয়েছে, তাদের হার্ট এই বাড়তি চাপ সহ্য করতে পারে না। ফলে দাবদাহের সময় হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া যারা হার্ট ফেইলিউরের ওষুধ খান, তাদের দ্রুত পানিশূন্যতা হতে পারে।
২. কিডনিতে পাথর ও কিডনি রোগ
গরমের দিনে কিডনি পাথরের সমস্যা মারাত্মক রূপ নেয়। শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ঘাম হয়ে বের হয়ে যাওয়ার পর যদি পর্যাপ্ত পানি পান না করা হয়, তবে প্রস্রাবে খনিজের ঘনত্ব বেড়ে যায়। এই খনিজগুলো জমে গিয়ে দ্রুত কিডনিতে পাথর তৈরি করে। এছাড়া ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীদের কিডনিতে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদের কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. আর্থ্রাইটিস বা বাতব্যথা
অনেকে ভাবেন বাতব্যথা শুধু শীতকালেই বাড়ে, কিন্তু ধারণাটি ভুল। অতিরিক্ত গরম এবং ভ্যাপসা আবহাওয়ায় শরীরের জোড়াগুলোর ভেতরের টিস্যু ফুলে যায়, যা বাতের ব্যথা ও ফোলাভাব বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া পানিশূন্যতার কারণে রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায়, যা ‘গাউট’ বা গেঁটে বাতের রোগীদের পায়ের আঙুলে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি করে।
৪. অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্ট
গরম ও আর্দ্র বাতাস ফুসফুসের শ্বাসনালীকে সংকুচিত করে ফেলে। এর ওপর গরমের দিনে বাতাসে ওজোন গ্যাস ও ধূলিকণার পরিমাণ বেড়ে যায়, যা শ্বাসনালিতে ইনফেকশন তৈরি করে হঠাৎ অ্যাজমা অ্যাটাক বা শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করতে পারে।
৫. ডায়াবেটিস
তীব্র গরমে ডায়াবেটিস রোগীদের ব্লাড সুগার বা রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত গরমে রক্তনালী প্রসারিত হওয়ায় ইনসুলিন দ্রুত কাজ করে সুগার হুট করে কমিয়ে দিতে পারে। আবার পানিশূন্যতার কারণে রক্ত ঘন হয়ে সুগার হঠাৎ অনেক বাড়িয়েও দিতে পারে। তাই গরমে নিয়মিত সুগার মাপা উচিত।
৬. মাইগ্রেন বা তীব্র মাথাব্যথা
গ্রীষ্মের কড়া রোদ, সূর্যের তীব্র আলো এবং আবহাওয়ার চাপের তারতম্যের কারণে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এর সাথে যুক্ত হয় ডিহাইড্রেশন ও অনিদ্রা, যা মাইগ্রেনের রোগীদের তীব্র মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৭. মানসিক অবসাদ ও দুশ্চিন্তা
গরমের কারণে মানুষের মেজাজ খিটখিটে হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরমে মানুষের শরীরের ‘স্ট্রেস রেসপন্স’ বা মানসিক চাপের হরমোন বেশি সক্রিয় হয়, যা দুশ্চিন্তা ও প্যানিক অ্যাটাক বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া, গরমের কারণে রাতে ঘুম না হওয়া ডিপ্রেশনকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
৮. লুপাস
লুপাস এমন একটি রোগ যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিজের চামড়া ও অঙ্গকে আক্রমণ করে। লুপাস রোগীরা রোদের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হন। সামান্য রোদে গেলেই তাদের ত্বকে লালচে র্যাশ, তীব্র ক্লান্তি এবং জয়েন্টে অসহ্য ব্যথা শুরু হতে পারে।
৯. মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস
স্নায়ুর এই জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেই স্নায়বিক সংকেত আদান-প্রদান বন্ধ হয়ে যায়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘উথফস ফেনোমেনন’ বলা হয়। এর ফলে রোগীরা প্রচণ্ড ক্লান্তি, পেশীর দুর্বলতা ও হাত-পা অবশ হওয়ার সমস্যায় ভোগেন।
এই গরমে সুস্থ থাকতে চিকিৎসকদের পরামর্শ হচ্ছে :
পর্যাপ্ত তরল খাবার: তৃষ্ণা না পেলেও দিনে অন্তত আড়াই থেকে তিন লিটার পানি, ডাবের পানি বা লেবুর শরবত পান করুন।
পোশাকের দিকে নজর: বাইরে বের হলে হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরুন। সাথে ছাতা, সানগ্লাস এবং একটি ছোট হাতপাখা রাখুন।
ওষুধের রিভিউ: যারা নিয়মিত প্রেসার, হার্ট বা ডিপ্রেশনের ওষুধ খান, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ কিছু ওষুধ গরমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।
রোদের সময়টা এড়িয়ে চলুন: সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খুব জরুরি কাজ না থাকলে রোদে বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকুন।





