চীনা ব্লকবাস্টার সিনেমা নিয়ে সিঙ্গাপুরে বিতর্কের কারণ কী?

চীনা চলচ্চিত্র ‘ডিয়ার ইউ’-এর প্রায় পুরো সংলাপই চীনের চাওশান অঞ্চলের টিওচিউ উপভাষায় ধারণ করা হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বজুড়ে কোনো সিনেমা সুপারহিট হলে সাধারণত তার বক্স অফিস কালেকশন কিংবা তারকাদের অভিনয় নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু এবার ঘটল সম্পূর্ণ এক ভিন্ন ঘটনা। চীনের একটি ব্লকবাস্টার সিনেমা এবার সীমানা পেরিয়ে সুদূর সিঙ্গাপুরে এক রাষ্ট্রীয় ও জাতিগত পরিচয়ের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সিনেমাটির নাম ‘ডিয়ার ইউ’। চীনের বক্স অফিসে ঝড় তোলা এই আবেগঘন সিনেমাটি সিঙ্গাপুরের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই সেখানে শুরু হয়েছে নিজেদের ভাষা ও ঐতিহ্য হারানোর এক তিক্ত-মধুর লড়াই।
‘ডিয়ার ইউ’ সিনেমাটি মূলত চীনের ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক ভাষা ‘টিওচিউ’-তে নির্মিত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশেরই বেশি মানুষ জাতিগতভাবে চীনা এবং প্রবীণ প্রজন্মের অনেকেই এই টিওচিউ ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু সিনেমাটি যখন সিঙ্গাপুরে মুক্তি পায়, তখন এর মূল ভাষা বাদ দিয়ে চীনের রাষ্ট্রভাষা ‘ম্যান্ডারিন’-এ ডাব করে প্রদর্শন শুরু হয়।
আর তাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন সিঙ্গাপুরের সাধারণ মানুষ। তাদের দাবি, সিনেমার আসল আবেগ রয়েছে এর নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায়। জোর করে ম্যান্ডারিন চাপিয়ে দেওয়ায় সিনেমার মূল আবেদনটাই হারিয়ে গেছে।
টিওচিউ ভাষার মাত্র কয়েকটি বিশেষ শো-র ব্যবস্থা করা হলে, মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যে সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এমনকি অনেকে সিনেমাটি আসল ভাষায় দেখতে প্রতিবেশী দেশ মালয়েশিয়াতেও ছুটে যাচ্ছেন!
এই ঘটনা সিঙ্গাপুরের সরকারের এক দীর্ঘদিনের বিতর্কিত নীতিকে আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছে। ১৯৬০ ও ৮০-এর দশকে সিঙ্গাপুর সরকার চীনা সম্প্রদায়কে এক ছাতার নিচে আনতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার জন্য ‘স্পিক ম্যান্ডারিন ক্যাম্পেইন’ চালু করে। স্কুল-কলেজ এবং গণমাধ্যম থেকে টিওচিউ, হোক্কিয়েন, ক্যান্টনিজের মতো আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষাগুলোকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়।
সরকারের এই নীতি এতটাই সফল হয়েছিল যে, ১৯৮০ সালে যেখানে সিঙ্গাপুরের ৭০ শতাংশ চীনা পরিবার বাড়িতে নিজেদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলত, ২০২০ সালে তা কমে মাত্র ৮.৭ শতাংশে নেমে এসেছে! বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা এখন কেবল ইংরেজি ও ম্যান্ডারিন চেনে, ফলে হারিয়ে গেছে তাদের পূর্বপুরুষদের ভাষা ও ঐতিহ্য।
ভাষাবিদ ও গবেষকদের মতে, ‘ডিয়ার ইউ’ সিনেমাটি কেবল একটি বিনোদন নয়, এটি সিঙ্গাপুরের চীনাদের শিকড়ের গল্প। ১৯ শতকে লাখ লাখ চীনা নাগরিক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যেভাবে সিঙ্গাপুরে এসে কঠিন জীবনযুদ্ধ করেছিলেন, সিনেমাটির গল্প ঠিক তেমনই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, সিঙ্গাপুরের তরুণরা এখন এই ভাষাগুলোকে বিদেশি ভাষার মতো ‘শখ’ করে শিখলেও, বাস্তবে কথা বলার মানুষ না থাকায় এগুলো টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এই সিনেমার মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের মানুষ আসলে তাদের হারিয়ে যাওয়া ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য এক ধরণের ‘শোক প্রকাশ’ করছেন।
তীব্র প্রতিবাদের মুখে সিঙ্গাপুর সরকার অবশ্য কিছুটা নমনীয় হওয়ার আশ্বাস দিয়েছে এবং প্রেক্ষাগৃহে মূল আঞ্চলিক ভাষার শো বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছে।





