মন্টুর জন্য ভালোবাসা

ছবি এঁকেছেন অরবিন্দ হালদার
তোমাদের খুব ভালোবাসতেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। কত কত পাপেট বানিয়েছেন, পাপেট শো করেছেন তোমাদের জন্য। ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই মহান শিল্পী গত ২৯ জুন চিরদিনের মত চলে গেলেন! তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে এই লেখা লিখেছেন টোকন ঠাকুর
ল্যুভ মিউজিয়াম দেখার সুযোগ অনেকেই পায় না। কিন্তু মন্টুর জন্য কলকাতা থেকে প্যারিসে গিয়ে ল্যুভ দেখার সুযোগ আসে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়েই। মন্টুর পুরো নাম মুস্তাফা মনোয়ার। বাবা কবি গোলাম মোস্তফা। বড় ভাই ক্যাপ্টেন আনোয়ার ছিলেন বৈমানিক, যিনি ১৯২৪ সালে ভারতীয় প্রথম বাঙালি হিসেবে উড়িয়েছিলেন বিমান। বড় ভাইয়ের সঙ্গেই ছোট ভাই মুস্তাফা মনোয়ার ল্যুভ দেখার সুযোগ পান।
দিনকয়েক আগে চিরদিনের মধ্যে উড়াল দিলেন মন্টু ভাই। অন্য এক দুনিয়ায়। তোমরা কি জানো, মুস্তাফা মনোয়ার কী করতেন? ছিলেন চিত্রশিল্পী, পড়েছেন কলকাতা আর্ট কলেজে। জলরঙে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন। কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এলেন একদিন। আদিতে তাদের বাড়ি ছিল ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার পাশের গ্রাম মনোহরপুরে। ওই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে শীর্ণকায় কুমার নদ।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের আগ্রহে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতা জীবনের প্রথম ব্যাচে যাদেরকে তিনি ছাত্র হিসেবে পান, তাদের মধ্যে বিখ্যাত শিল্পী মনিরুল ইসলাম যেমন আছেন, তেমনি আছেন প্রখ্যাত সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী এবং শিল্পী রফিকুন নবীও, রনবী নামে ‘টোকাই’ কার্টুন এঁকে অনেক খ্যাতি কুড়িয়েছেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশন, শিল্পকলা একাডেমিসহ সরকারের নানা প্রতিষ্ঠানে বড় বড় পদে দায়িত্ব পালন করেছেন মুস্তাফা মনোয়ার। নাচের কোরিওগ্রাফি করা, গান গাওয়া, ছবি আঁকাসহ অনেক কিছু করলেও বর্তমান বাংলাদেশের প্রায় সবাই তাকে চেনে এ দেশের আধুনিক পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ হিসেবে। যখন মুস্তাফা মনোয়ার দশম শ্রেনির ছাত্র, সেই ১৯৫৫ সালে, তখন সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’র শুটিং চলছিল। ক্লাস পালিয়ে ‘পথের পাঁচালী’র শুটিং দেখতে গেছেন।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশাবিদ কে বা কারা? জানি, এ প্রশ্নের উত্তর তোমাদের মুখস্থ। তবু বলে দিচ্ছি আবারও— ভাস্কর নভেরা আহমেদ ও শিল্পী হামিদুর রহমান। কিন্তু জানো কি, শহীদ মিনারের পেছনে যে গোলাকার লাল বৃত্ত, ঐটা নকশাতে যুক্ত করেন মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৯৩ সালের সাফ গেমসের মূল নকশাও তিনিই করেছিলেন।
মাল্টিমিডিয়ায় পাপেট ডেভেলপমেন্টে মুস্তাফা মনোয়ারের অনেক ছাত্রের মধ্যে আমিও একজন। পাপেট শো করতেন তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে, ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী অনেকেই আজ দেশের বিখ্যাত মানুষ। মুস্তাফা মনোয়ার প্রয়াত হলেন বটে; কিন্তু বাংলাদেশের পাপেট শিল্পের জন্য তিনি পথিকৃৎ হয়েই থেকে যাবেন। ভীষণ রবীন্দ্র-অনুরাগী তিনি; অনুরাগী সত্যজিৎ রায়েরও। এই দুজন ছাড়া প্রায় আর কাউকেই তিনি তার ভাবনায় নিতে চাইতেন না।
এবার একটি স্মৃতিকথা বলি? আমি নিজে যখন এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম, তখন ছিল শীতকাল। পরীক্ষার মধ্যেই এক রাতে বাইসাইকেল চালিয়ে গেলাম শৈলকুপার পাশের গ্রাম মনোহরপুরে। সেখানে, কবি গোলাম মোস্তফা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে অনুষ্ঠান হচ্ছিল। দেখলাম, মঞ্চে বসে আছেন কবি আল মাহমুদ ও কবি তালিম হোসেন। সেই প্রথম আমার পাঠ্যবইয়ের কবি আল মাহমুদকে সামনাসামনি দেখলাম। তখনো তিনি দাড়িগোঁফ রাখেননি। দেখলাম মোস্তফা আজীজকে। তিনি আর্টিস্ট। তার আরেকটি পরিচয় হলো, তিনি কবি গোলাম মোস্তফার আরেক ছেলে। গ্লাস মার্কার দিয়ে কার্টিজ পেপারে মানুষের প্রতিকৃতি আঁকতেন মোস্তফা আজীজ। সেই রাতেও দেখলাম তিনি মঞ্চের এক কোণে অবস্থান নিয়ে আলোচকদের প্রতিকৃতি এঁকে যাচ্ছেন। আলোচক বলতে কবি তালিম হোসেন, কবি আল মাহমুদ ও শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, এ লেখার শুরুতেই যার ডাকনাম লিখেছি, মন্টু।
মন্টু স্যার চলে গেলেন দুনিয়া ছেড়ে। স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা রইল। চিরকাল যাকে শ্রদ্ধা করা যায়, তিনি এমন একজন মানুষ, এমন একজন শিল্পী।




