আতঙ্কের নাম ‘ব্লু হোয়েল’

প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির সঙ্গে তৈরি হয়েছে নানা বিপজ্জনক ফাঁদ। একসময় বিশ্ব জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল ‘ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ’ নামে একটি কথিত অনলাইন প্রবণতা। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
নিজের বাঁ হাতের বাহুতে ক্ষত তৈরি করে একটি নীল তিমির ছবি এঁকেছিল কিশোরটি। ওটা নিছক কোনো আঁকিবুঁকি ছিল না; বরং তার শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক অদ্ভুত মানসিক চাপের চিহ্ন। এর কিছুদিন পরই ঢাকার মিরপুরে তার মৃত্যু ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে নানা প্রশ্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন আলোচনার কেন্দ্রে একটি নাম— ব্লু হোয়েল। অভিযোগ ওঠে, ভয়ংকর এই অনলাইন গেমের নির্দেশ মেনেই কি তবে নিজের শরীরে তিমির ছবি এঁকেছিল কিশোরটি? শেষ পর্যন্ত কি তাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল মৃত্যুর দিকে?
ঘটনাটি ২০১৭ সালের অক্টোবরের। পুলিশ কিশোরটির শরীরে ক্ষতচিহ্ন পাওয়ার কথা জানায়। তার মোবাইল ফোনে ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। তবে ওই মৃত্যুর সঙ্গে কথিত গেমটির সরাসরি সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। একই সময়ে গোপালগঞ্জেও এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় ব্লু হোয়েলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনা বাংলাদেশে অভিভাবক, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে।
কিন্তু ব্লু হোয়েল আসলে কী? সত্যিই কি কোনো সুসংগঠিত অনলাইন গেমের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হতো, নাকি বাস্তব কিছু ঘটনা, অনলাইন অপরাধ এবং অতিরঞ্জিত প্রচারণা মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক?
২০১৬ সালের দিকে রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ভিকন্টাক্টে’ বা ভিকের কয়েকটি অনলাইন গ্রুপকে কেন্দ্র করে ব্লু হোয়েল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তী বছর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রচারিত বর্ণনা অনুযায়ী, এটি ছিল ৫০ দিনের একটি কথিত অনলাইন চ্যালেঞ্জ। এতে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত একজন ‘কিউরেটর’ বা নিয়ন্ত্রক। তার নির্দেশে প্রতিদিন একটি করে কাজ সম্পন্ন করতে হতো। শুরুতে কাজগুলো সাধারণ মনে হলেও ধীরে ধীরে সেগুলো বিপজ্জনক হয়ে উঠত বলে দাবি করা হয়। একপর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের ভয় দেখানো, মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, একাকিত্বে ঠেলে দেওয়া এবং শেষ ধাপে আত্মহত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।
রাশিয়ার ফিলিপ বুদেইকিন নামের এক ব্যক্তিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের স্রষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে
সবচেয়ে আতঙ্কজনক অভিযোগগুলোর একটি ছিল শরীরে ধারালো বস্তু দিয়ে নীল তিমির ছবি বা ক্ষতচিহ্ন তৈরি করা। এই ক্ষতচিহ্নই পরবর্তী সময়ে ব্লু হোয়েল আতঙ্কের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা ছবি ও প্রতিবেদনে বিষয়টি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। তবে এই আতঙ্কের বিস্তার শুধু কথিত গেমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সুযোগ নিয়ে ছড়াতে থাকে নানা গুজব। ২০১৭ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়, নির্দিষ্ট সময়ে দেশের সব অ্যান্ড্রয়েড ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লু হোয়েল গেম ঢুকে যাবে এবং ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হবে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এই বার্তাকে সম্পূর্ণ ভুয়া ও ভিত্তিহীন বলে জানায়। অর্থাৎ কথিত গেমের পাশাপাশি অপতথ্য ও গুজবও মানুষের মনে ভয়াবহ আতঙ্ক তৈরি করেছিল।
রাশিয়ার ফিলিপ বুদেইকিন নামের এক ব্যক্তিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের স্রষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাকে ঘিরে অপরাধের অভিযোগ ও বিচারিক কার্যক্রমও আলোচনায় আসে। তবে বিশ্ব জুড়ে প্রচারিত সব ঘটনা, মৃত্যুর সংখ্যা কিংবা একটি কেন্দ্রীয় অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে ব্লু হোয়েল নিয়ে প্রচারিত প্রতিটি দাবি ও ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
তবে সব আলোচনাকে নিছক গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। ২০২০ সালে জেএমআইআর মেন্টাল হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ইউটিউব ও টুইটারে ব্লু হোয়েলবিষয়ক কনটেন্ট বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকরা উল্লেখ করেন, চ্যালেঞ্জটির সুনির্দিষ্ট অস্তিত্বের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলেও আত্মক্ষতিমূলক কনটেন্টের প্রচার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ কিশোর-কিশোরীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।



