ভিন দেশের ভূত
বানশির মৃত্যুসংকেত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাঝরাত। আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি কেরির লিসলফটিন অ্যাবের শতাব্দীপ্রাচীন ধ্বংসাবশেষ ঘন, স্যাঁতসেঁতে কুয়াশার চাদরে ঢাকা। চারপাশের চেনা প্রকৃতি আচমকা এক আদিম স্তব্ধতায় জমে গেল। ঠিক তখনই বাতাসে ভেসে এলো এক বুকফাটা বিলাপ। মানুষের কান্নার মতো শোনায়, অথচ তার তীব্রতা কোনো মরণশীল মানুষের কণ্ঠের নয়। নির্জন মেঠোপথ ধরে ও’কনর বংশের এক যুবক সাইকেল চালিয়ে ফিরছিলেন। যুবকের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল হিমশীতল স্রোত। কোনো ভুল নেই, এই সেই অভিশপ্ত ডাক, যা শুনলে আয়ারল্যান্ডের মানুষ ভয়ে শিউরে ওঠে। এটি বানশির কান্না। আর আইরিশ লোকবিশ্বাস বলে, বানশির কান্না শোনার অর্থ— খুব শিগগির ও’কনর পরিবারের কারও মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে।
এই অতিপ্রাকৃত সত্তার নামের উৎস প্রাচীন আইরিশ গেলিক শব্দ ‘বিন সি’, যার শাব্দিক অর্থ ‘পরীদের ঢিবির মায়াবী নারী’। এরা সাধারণ কোনো মৃত মানুষের আত্মা বা ভূত নয়; বরং আয়ারল্যান্ডের লোকবিশ্বাসের এক নিঃসঙ্গ, একাকী পরী। বানশি মূলত তিনটি ভিন্ন ছদ্মবেশে মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়। অনিন্দ্যসুন্দরী রুপালি চুলের এক তরুণী, গভীর শোকে মুহ্যমান কোনো অভিজাত প্রবীণ নারী অথবা কোঁচকানো চামড়ার ভয়ংকর কুৎসিত
সবচেয়ে গা ছমছমে তথ্য হলো, বানশি সবার দুয়ারে গিয়ে ভাগ্যলিপি পড়ে না। কিংবদন্তি অনুযায়ী, আয়ারল্যান্ডের শুধু পাঁচটি প্রাচীন ও শক্তিশালী অভিজাত বংশের (ও’নিল, ও’কনর, ও’ব্রায়েন, ও’গ্রেডি এবং কাভানা) মৃত্যুর পূর্বাভাস দিতেই সে হাজির হয়। এই পরিবারের কোনো সদস্য পৃথিবীর যে প্রান্তেই নির্বাসিত থাকুক না কেন, এমনকি আটলান্টিক পার হয়ে আমেরিকার কোনো ব্যস্ত শহরে গিয়েও যদি আত্মগোপন করে, তার
গভীর রাতে বোস্টন বা নিউ ইয়র্কের বহুতল ভবনের ইটের দেয়ালে তার নখের আঁচড়ের শব্দ পাওয়া যায়। সে যখন রাতের অন্ধকারে কোনো প্রাচীন গাছের নিচে বসে তার দীর্ঘ চুলে অলৌকিক চিরুনি চালায়, তখন তীব্র রাগে ও যন্ত্রণায় নিজের চুল নিজেই উপড়ে ফেলে। গ্রামীণ আয়ারল্যান্ডে আজও মাটিতে পড়ে থাকা কোনো চিরুনি কেউ স্পর্শ করার দুঃসাহস দেখায় না। বিশ্বাস করা হয়, ওটি বানশির ফেলে যাওয়া জিনিস এবং তা ছোঁয়া মানে নিজের অজান্তেই
বাস্তবতার নিরিখে, মধ্যযুগীয় আয়ারল্যান্ডের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ভাড়াটে একদল নারী বিলাপকারী বা ‘কিনার’দের প্রথা থেকে এই মিথের জন্ম বলে ধারণা করা হলেও বিজ্ঞানের যুক্তির বাইরে গিয়েও কিছু ঘটনা আজও মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়।



