অশরীরী জগৎ
মেছোভূত

আঁকা : নওরিন জাহান
নাম শুনে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এরা মাছের প্রতি অসম্ভব দুর্বল বা মাছখোর ভূত। মাছের প্রতি তাদের ভালোবাসা এতটাই বেশি যে, মাছ পাওয়ার জন্য তারা ভয় দেখাতেও পিছপা হয় না। সাধারণ ভূতেরা শ্মশান বা পরিত্যক্ত বাড়িতে আড্ডা দিলেও মেছোভূত খাল, বিল, পুকুর বা নদীর ধারে ঘোরাঘুরি করে বেড়ায়।
বাংলার লোককথা অনুযায়ী, যারা জীবদ্দশায় মাছ ছাড়া একবেলাও খেতে পারতেন না এবং মাছ ধরতে গিয়েই হয়তো কোনো দুর্ঘটনা বা অপঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন, মৃত্যুর পর তারাই মেছোভূত হয়ে ফিরে আসেন। বাঙালির মাছপ্রীতি যেমন অকৃত্রিম, তেমনি মেছোভূতের মাছের লোভও অসীম। আর যদি সেই মাছ ভাজা হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই! অনেকে বলেন, রাতের বেলা এদের নাকি গলায় মাছ চাইতে শোনা যায় অনেকটা এভাবে, ‘ওঁরে আমায় মাছ দিবি না?’
জেলেরা যখন রাতের বেলা নদী বা বিলে মাছ ধরতে যান, তখন মেছোভূতদের উৎপাতে তাদের মাছের ঝোলা বা জাল থেকে মাছ চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। মাছ কেড়ে নেওয়ার জন্য এরা জেলেদের মেরে ফেলারও হুমকি দেয় বলে লোককথায় প্রচলিত। মেছোভূতের সবচেয়ে প্রিয় মাছ নাকি ইলিশ। রাতে কেউ হাতে ইলিশ নিয়ে বাড়ি ফিরলে পথে মেছোভূতের অদৃশ্য টান পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই গ্রামবাংলার মানুষ রাতে একা মাছ ধরতে যেতে বা মাছ হাতে নির্জন পথে ফিরতে ভয় পেতেন।
বাংলা ভূতের গল্প বা কমিকসে মেছোভূতের সরব উপস্থিতি রয়েছে। প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট নারায়ণ দেবনাথের ‘হাঁদা-ভোদা’ বা ‘নন্টে-ফন্টে’ সিরিজে মেছোভূতদের কাণ্ডকারখানা পাঠককে আনন্দ দিয়েছে। আবার লেখক মনোজ বসুর ‘ভূতের মাছ ধরা’র মতো গল্পে মেছোভূতের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। মজার বিষয় হলো, ভূত হওয়ার পর আগুন ও লোহা ছুঁতে পারে না বলে নিজেরা মাছ ভেজে খেতে পারে না। ফলে মাছ ধরতে পারে, কিন্তু ভাজতে পারে না। কী আফসোসের ব্যাপার!
একসময় গ্রামগঞ্জে যদি কোনো ঝোপঝাড় বা বাঁশঝাড় মেছোভূতের আখড়া হিসেবে পরিচিতি পেত, তবে মাছ নিয়ে ফেরার সময় জেলেরা সেখানে অল্প কিছু মাছ ফেলে রেখে আসতেন। এতে নাকি মেছোভূত আর বিরক্ত করত না।
মেছোভূত নিয়ে হাজারো গল্প প্রচলিত থাকলেও এর পেছনে হয়তো জেলেদের রাতের বেলার ভয় আর মাছ চুরি হওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ আছে। আপনি নিজে কখনো মাছের ঝোলা নিয়ে যাওয়ার সময় কোনো অদৃশ্য টান অনুভব করেছেন? করে থাকলে সাবধান! হয়তো মেছোভূত আপনার মাছের দিকে নজর দিয়েছে!





