বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস
আত্মহত্যা ও আমাদের দায়বদ্ধতা

কেউ আত্মহত্যা করলে আমরা প্রথমেই জানতে চাই, ‘কেন করল?’ পরীক্ষায় ব্যর্থতা, সম্পর্কের টানাপড়েন, পারিবারিক অশান্তি কিংবা আর্থিক সংকট— সামনে থাকা কারণগুলোর কোনো একটিকে আমরা দায়ী করে কিছুটা স্বস্তি খুঁজি। কিন্তু আমরা কি একবারও ভেবে দেখি, একজন মানুষ কি সত্যিই একটি ঘটনার কারণে ভেঙে পড়েন? নাকি ঘটনার অনেক আগে থেকেই তার ভেতরে কিছু একটা তিলে তিলে ধ্বংস হতে থাকে?
প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস।
বাংলাদেশে আত্মহত্যার পরিসংখ্যানটি বেশ উদ্বেগজনক। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর হার ছিল প্রতি লাখে ৮ দশমিক শূন্য ৭, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ২ দশমিক ৪-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে স্থানীয় জরিপ বলছে, এই হার তুলনামূলকভাবে এখনো অনেক বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অর্থায়নে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পরিচালিত জাতীয় জরিপ (২০২২-২৩) বলছে, ২০২৩ সালে দেশে ২০ হাজার ৫০৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রতি লাখে এই হার ছিল ১২ দশমিক ৪। ২০১৬ সালে প্রতি লাখে এই হার ছিল ১৪ দশমিক ৭।
১৯৯০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বের আত্মহত্যার প্রবণতা বিশ্লেষণ করে ২০২৫ সালে ল্যানসেট সাময়িকীতে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, বিশ্বে আত্মহত্যার বয়স সমন্বিত মৃত্যুহার ১৯৯০ সালের প্রতি লাখে ১৪ দশমিক ৯ থেকে কমে ২০২১ সালে ৯ দশমিক শূন্য হয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ল্যানসেট সাধারণত অনুমিত সংখ্যা ব্যবহার করে।
বিশেষ করে ১৫-১৭ বছর বয়সী নারী এবং ১৮-২৪ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। শহরের তুলনায় গ্রামে আত্মহত্যার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। আত্মহত্যার পেছনে সামাজিক, পরিবেশগত ও জিনগত কারণ কাজ করে। নিঃসঙ্গতা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, সহিংসতা এবং শৈশবের মানসিক আঘাত মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও বয়সসীমা চিহ্নিত করে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে আমাদের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত নয় যে— ‘কেন করল?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত— ‘সে যখন ভালো ছিল না, তখন আমরা কি সত্যিই তার পাশে ছিলাম?’
লেখক: কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শদাতা, সিএস কেয়ার লি., মিরপুর






