তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিস বাড়ছে কেন

ছবি: সামিয়া
একসময় ডায়াবেটিসকে বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত রোগ হিসেবে ভাবা হলেও এখন কম বয়সীদের মধ্যে এ রোগ বাড়ছে। এর কারণ ও প্রতিরোধের বিষয়ে লিখেছেন ডা. জারিন তাসনিম
ডায়াবেটিস মূলত দুই ধরনের— টাইপ-১ ও টাইপ-২। টাইপ-১ ডায়াবেটিস একটি অটোইমিউন কন্ডিশন। এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে সাধারণত কম বয়সেই দেখা যায়। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস বেড়ে গেছে। আর এর অন্যতম কারণ হচ্ছে জীবনযাত্রার পরিবর্তন।
কেন তরুণ বয়সে ডায়াবেটিস হচ্ছে
তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিস বাড়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অতিরিক্ত ওজন (বিশেষ করে পেটের মেদ), কম শারীরিক পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং পরিবারের কারও ডায়াবেটিসের ইতিহাস।
পড়াশোনা, অফিসের কাজ, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার কিংবা টেলিভিশনের সামনে দীর্ঘ সময় বসে কাটানোর কারণে হাঁটা বা শরীরচর্চার সুযোগ কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার, কোমল পানীয়, ফাস্টফুড ও বেশি ক্যালরির খাবার।
ধূমপানসহ কিছু অভ্যাসও ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তরুণদের ডায়াবেটিসের লক্ষণ কী
ডায়াবেটিসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শুরুতে অনেকের তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে বাড়তে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরা নাও পড়তে পারে। তবে অতিরিক্ত পিপাসা, বারবার প্রস্রাব হওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা এবং কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অনেক তরুণ আবার এসব লক্ষণকে কাজের চাপ, ঘুমের অভাব বা সাধারণ দুর্বলতা মনে করে এড়িয়ে যান। এ কারণে সাধারণ লক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং ঝুঁকি থাকলে শুধু লক্ষণের অপেক্ষা না করে রক্তের শর্করা পরীক্ষা করা জরুরি।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন
পরিবারে বাবা, মা, ভাই বা বোনের ডায়াবেটিস থাকলে তরুণ বয়স থেকেই সচেতন হওয়া উচিত। অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রম কম করা, আগে থেকেই রক্তে শর্করা বাড়ার সমস্যা থাকা এবং হৃদরোগ বা এর ঝুঁকির কিছু কারণ থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলেও ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি
যাদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ, কম বয়স বলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি নেই, এমন ধারণা ঠিক নয়। কেউ যদি অল্প বয়সেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন, তাহলে বয়স কম বলে চিকিৎসায় গুরুত্ব কম দেওয়া উচিত নয়। ডায়াবেটিসের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বয়সের কোনো ভেদাভেদ নেই। রোগ শনাক্ত হলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।
জীবনযাত্রার পরিবর্তনই প্রতিরোধের উপায়
ডায়াবেটিস প্রতিরোধে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মধ্যে প্রথমেই আসে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। সাদা ভাত, চিনি, মিষ্টি, চা, কফি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্টফুড ও বেকারির খাবার বাদ দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। লাল চালের ভাত, প্রচুর শাকসবজি এবং আমিষ জাতীয় খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
নিয়মিত শরীরচর্চাও করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট এমন শরীরচর্চা করা উচিত, যাতে শরীরে ঘাম হয়। এর পাশাপাশি জিমনেশিয়ামে স্ট্রেন্থেনিং ও ওয়েটলিফটিংয়ের মতো ব্যায়ামও সহায়ক হতে পারে। যাদের স্থূলতা রয়েছে, তাদের অবশ্যই ওজন কমানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ডায়াবেটিস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ধূমপানও পরিহার করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ও পরিমিত বিশ্রাম নিন ও মানসিক চাপ কমান।
কম বয়সে ডায়াবেটিস মানেই ঝুঁকি কম নয়
অনেকের ধারণা, ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সে ডায়াবেটিস হলে এখন তো বয়স কম, তাই জটিলতা অনেক পরে হবে— এমন ধারণা ঠিক নয়। ডায়াবেটিসের জটিলতা শুধু বয়সের ওপর নির্ভর করে না। কম বয়সে ডায়াবেটিস অনেক সময় জটিল হতে পারে। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস থাকলে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, অন্ধত্ব, কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়া ও কিডনি ফেইলিওর, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং রক্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া হাত-পায়ে ঝিনঝিন করা, অনুভূতি কমে যাওয়া, পায়ে ঘা হওয়া, খাবার হজমে সমস্যা এবং মাথা ঘোরার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ডায়াবেটিসের কিছু জটিলতা আবার হঠাৎ করেও দেখা দেয়। এর মধ্যে কিটোএসিডোসিস রয়েছে। দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা না হলে এ অবস্থায় জীবন সংশয়ের আশঙ্কা থাকতে পারে। তাই ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ নয়, ডায়াবেটিসের কারণে কোনো জটিলতা তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং জরুরি।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসে অতিরিক্ত পিপাসা, বারবার প্রস্রাব হওয়া অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা এবং কারণ ছাড়াই ওজন কমার লক্ষণ দেখা দিতে পারে
শরীরচর্চা কতটা জরুরি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বা আক্রান্তের সময় পেছানোর জন্য নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার পরামর্শ দেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চার কথা বলা হয়েছে। তবে জিমে গিয়ে কঠিন ব্যায়াম করতে হবে এমন নয়। নিয়মিত হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শারীরিক কাজও সক্রিয় থাকার অংশ হতে পারে।
তরুণদের এখনই সচেতন হতে হবে
তরুণ বয়সে ডায়াবেটিস ধরা পড়লে জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং ধূমপান বর্জনের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: মেডিকেল অফিসার, রেসিডেন্ট, বিএমইউ



