টোটো কোম্পানি
লাংকাউইর জিওফরেস্টে একবেলা

লাংকাউইর তাসিক দায়াং বুন্তিং জিওফরেস্ট
মালয়েশিয়ায় বেড়ানোর কথা বললেই লাংকাউইর নাম চলে আসে। আর লাংকাউই ভ্রমণ অপূর্ণ থেকে যায় যদি না ঘুরে আসা হয় তাসিক দায়াং বুন্তিং মার্বেল জিওফরেস্ট পার্ক। লিখেছেন জামাল মো. আবু নাছের
২০২৫ সালের আগস্টের একদিন। সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। এর মধ্যে শুরু টিপটিপ বৃষ্টি। স্থানীয় একটি দোকান থেকে মাত্র ৫ রিংগিত দিয়ে একটি পাতলা রেইনকোট কিনে নিলাম। এরপর কুয়াহ জেটি থেকে শেয়ারে স্পিডবোটে চড়ে রওনা হলাম। বোট ছাড়ার কিছুক্ষণ পরই বৃষ্টি থেমে গেল। মেঘ সরে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়তেই প্রকৃতি যেন নতুন রূপে আমাদের স্বাগত জানাল।
স্পিডবোটটি যত সমুদ্রের বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছিল, ততই চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ছোট-বড় সবুজ দ্বীপ, নীল জলরাশি আর আকাশ ছুঁতে চাওয়া মার্বেল পাহাড়।
আমাদের বোটে চীন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পর্যটক আছেন। হঠাৎ কয়েকজন তরুণ-তরুণী ইংরেজি গান গাইতে শুরু করল। মুহূর্তেই পুরো বোট উৎসবের আমেজে ভরে গেল। তাদের সঙ্গে তাল মেলাল অন্যরা। কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউ ভিডিও ধারণ করছে। ভাষা আলাদা হলেও আনন্দের ভাষা যে একই, তা নতুন করে অনুভব করলাম।
প্রায় আধঘণ্টা পর পৌঁছালাম তাসিক দায়াং বুন্তিং বা ‘অন্তঃসত্ত্বা নারীর হ্রদে’। স্থানীয় রূপকথা অনুযায়ী, একজন স্বর্গীয় রাজকুমারী এবং এক সাধারণ মানুষের প্রেমে জন্ম নেওয়া সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপর মারা গেলে তাকে এ হ্রদে সমাহিত করা হয়। লোকবিশ্বাস রয়েছে, কোনো সন্তানহীন নারী এর জলে গোসল করলে বা পানি পান করলে তিনি সন্তানসম্ভবা হতে পারেন।
ঘাট থেকে কিছুটা হাঁটা ও সিঁড়ি বেয়ে পৌঁছাতে হয় এই অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কাছে। চারদিকে সুউচ্চ মার্বেল পাহাড় আর মাঝখানে বিশাল স্বচ্ছ মিঠা পানির হ্রদ। দূর থেকে পাহাড়ের অবয়ব দেখে সত্যিই মনে হয়, একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী শুয়ে আছেন।
হ্রদের চারপাশে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই চোখে পড়ল পাহাড়ি ফলের দোকান। আম, আনারস, ড্রাগন, তরমুজ, পেঁপেসহ নানা রঙের টাটকা ফল দিয়ে সাজানো এক প্লেটের দাম ১০ রিংগিত। সেই সুমিষ্ট ফলের স্বাদ যেন এখনো মুখে লেগে আছে। এরপর নেমে পড়লাম হ্রদের স্বচ্ছ নীল পানিতে। ঠান্ডা পানির স্পর্শে শরীর-মন দুটোই সতেজ হয়ে উঠল। চারদিকে বিভিন্ন দেশের পর্যটক সাঁতার কাটছেন, ছবি তুলছেন, হাসছেন, গল্প করছেন। এত মানুষের ভিড়েও কোথাও কোনো অশোভন আচরণ, কটূক্তি বা বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ল না। সবাই একে অন্যের ব্যক্তিগত পরিসর, স্বাধীনতা ও সংস্কৃতিকে সম্মান করছিলেন। ভাবলাম, সভ্য পর্যটন সংস্কৃতির এমন সুন্দর চিত্র আমাদের দেশেও ছড়িয়ে পড়লে কী ভালোই না হতো!
ফেরার সময় স্পিডবোট আবারও সমুদ্রের বুক চিরে ছুটে চলল। আমি বারবার ফিরে তাকাচ্ছিলাম সবুজ পাহাড়গুলোর দিকে। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নীরবে বিদায় জানাচ্ছে। চোখের সামনে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল পাহাড়, কিন্তু হৃদয়ের ক্যানভাসে আঁকা হয়ে রইল সেই অপূর্ব দৃশ্য।
আরও দেখবেন
প্রকৃতির রূপ ও রোমাঞ্চের নানা অনুষঙ্গের এক নিখুঁত মেলবন্ধন মালয়েশিয়ার লাংকাউই দ্বীপপুঞ্জ। এ দ্বীপের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্যগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে লাংকাউই স্কাইক্যাব ও স্কাইব্রিজ। পাহাড়ের চূড়ায় কেব্্ল কারে চড়ে মেঘের ওপর ভেসে চলার অনুভূতি এবং বিশ্বের দীর্ঘতম বাঁকানো স্কাইব্রিজে হাঁটার রোমাঞ্চ ভ্রমণপিপাসুদের মনে চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায়।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অসাধারণ গন্তব্য কিলিম কার্স্ট জিওফরেস্ট পার্ক। এখানকার ম্যানগ্রোভ বন, চুনাপাথরের পাহাড়, রহস্যময় গুহা এবং নদীর বুকে চিল বা ঈগলের ওড়াউড়ি এককথায় অতুলনীয়।
সমুদ্রসৈকতপ্রেমীদের টানবে লাংকাউইর পান্তাই চেনং বিচ। বালিঘেরা এ প্রাণবন্ত সৈকতে প্যারাসেইলিং, জেট স্কিইংয়ের মতো নানা রোমাঞ্চকর ওয়াটার স্পোর্টসের পাশাপাশি সন্ধ্যার মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়। তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ চাইলে যেতে পারেন উত্তর দিকের তানজুং রু সৈকতে, যার স্বচ্ছ নীল জলরাশি ও সারি সারি ক্যাসুরিনা গাছ মন জুড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া দ্বীপের মূল জেটির কাছে অবস্থিত বিশাল আকৃতির ঈগল মূর্তিসংবলিত দাতরান লাং (ঈগল স্কয়ার) পর্যটকদের কাছে একটি আইকনিক ল্যান্ডমার্ক।
বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় কুয়ালালামপুর হয়ে কানেক্টিং ফ্লাইটে ল্যাংকাউই পৌঁছে যেতে পারবেন।






