আন্তোনিওনির চলচ্চিত্রে বিচ্ছিন্নতাবোধ

‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার’ সিনেমার দৃশ্য, ছবি: সংগৃহীত
২৯ সেপ্টেম্বর, ইতালীয় প্রসিদ্ধ চলচ্চিত্রকার মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনির জন্মদিন। ‘মাস্টার অব অ্যালিয়েনেশন’খ্যাত এ নির্মাতার কাজে অন্যতম প্রধান থিম বিচ্ছিন্নতাবোধ।
সভ্যতা যখন আধুনিকতার সুফল ভোগ করতে শুরু করেছে, শিল্পায়িত ও প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে জীবনযাপনে এসেছে বৈচিত্র্য, ব্যক্তিস্বাধীনতার কাঁধে ভর দিয়ে মানুষ নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছাদের প্রাধান্য দিতে শিখেছে, তখন একটি প্রায় অনারোগ্য মানসিক ব্যাধি মেলেছে ডালপালা। ব্যাধিটির পোশাকি নাম অ্যালিয়েনেশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধ। ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র সেই বিখ্যাত গানের মতো এর অনুভূতি, ‘ভেবে দেখেছ কি, তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে, তারও দূরে, তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।’ স্বভাবতই পশ্চিমা দুনিয়ায় এ বোধের বিস্তার ঘটেছে পৃথিবীর অন্য প্রান্তগুলোর চেয়ে বেশ আগে। বিশ শতকের শুরুতে তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সেই বোধকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুনিপুণভাবে যারা প্রকাশ করেছেন, তাদের মধ্যে মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি অগ্রগণ্য। এমনকি ‘মাস্টার অব অ্যালিয়েনেশন’ কিংবা ‘বিচ্ছিন্নতাবোধের কবি’ হিসেবেও তার খ্যাতি রয়েছে। আন্তোনিওনির চলচ্চিত্রে ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ টার্মটি মূলত আধুনিক ও শিল্পায়িত সমাজে মানুষের গভীর মানসিক দূরত্ব এবং একাকিত্বের প্রতিনিধি; চরিত্রগুলো যে অনুভূতি প্রতিনিয়ত অনুভব করে।
৯৪ বছরের আয়ুষ্কালে
১৫টি ফিচার ফিল্ম বানিয়েছেন আন্তোনিওনি। এর মধ্যে ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার’ (১৯৬০), ‘দ্য
নাইট’ (১৯৬১) ও ‘দ্য এক্লিপস’কে (১৯৬২) অনানুষ্ঠানিকভাবে তার ‘অ্যালিয়েনেশন ট্রিলজি’
হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ চলচ্চিত্রগুলোয় তিনি এমন সব চরিত্রের ওপর আলো ফেলেছেন, যারা
ব্যক্তিজীবনে ধনী ও সফল হলেও ভেতরে ভেতরে সম্পূর্ণ নিঃস্ব। দ্রুতগতির কাহিনির ওপর নির্ভর
না করে, মানুষের দিশাহারা অবস্থা দেখানোর জন্য তিনি নীরব শূন্যতা, স্থাপত্য আর প্রাকৃতিক
বা পারিপার্শ্বিক দৃশ্যপটের করেছেন ব্যবহার।
বিচ্ছিন্নতাবোধের আবহ আন্তোনিওনি তার চলচ্চিত্রে কয়েকটি স্তরের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এর অন্যতম হলো শারীরিক পরিসর ও স্থাপত্যকলা। চরিত্রগুলোকে তিনি নিষ্প্রাণ, আধুনিক দালানকোঠা কিংবা জনশূন্য প্রশস্ত সড়কের মধ্যে এমনভাবে দৃশ্যবন্দি করেছেন, যেন আর্থিক সচ্ছলতা ও অবাধ ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও তাদের বন্দি ও ক্ষুদ্র দেখায়। যেমন— ‘দ্য এক্লিপস’-এ চরিত্রগুলোর শীতল, নিষ্প্রাণ হৃদয় এবং সত্যিকার অর্থে ভালোবাসতে না পারার অক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে কাজ করে আধুনিক শেয়ারবাজার এবং রোমের শহরতলির জনশূন্য রাস্তাগুলো।
আন্তোনিওনির বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রকাশের আরও দুটি উপাদান হলো অন্তর্ধান ও অর্থহীনতা। ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার’-এ একটি পাথুরে দ্বীপে বেড়াতে গিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় এক নারী। খুঁজতে খুঁজতে একসময় অন্য চরিত্ররা তাকে একদম ভুলে যেতে থাকে। এর বদলে তারা মনোনিবেশ করে নিজেদের অগভীর প্রেমের দিকে। আধুনিক সমাজে মানুষের বন্ধন কতটা পলকা এবং একে অন্যের মন থেকে মানুষ কত সহজেই হারিয়ে যায়, তার সাক্ষ্য বহন করে এ চলচ্চিত্র।
অন্যদিকে, নিস্তব্ধ সমাপ্তির মাধ্যমেও চলচ্চিত্রে বিচ্ছিন্নতাবোধের রেশ ছড়িয়েছেন এ নির্মাতা। ‘দ্য এক্লিপস’-এর শেষ ৭ মিনিটের দৃশ্যখণ্ডে এমন একটি রাস্তার মোড় দেখিয়েছেন, যেখানে চলচ্চিত্রটির প্রধান দুই প্রেমিক-প্রেমিকা দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত সেখানে তাদের কেউই আসেনি। এই দৃশ্যপটে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বদলে জড় বস্তু, একটি পানির ড্রাম এবং পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া অপরিচিত পথচারীদের ওপর আলো ফেলে আন্তোনিওনি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভালোবাসার সম্পূর্ণ বিলুপ্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
‘দ্য নাইট’-এ তিনি এমন একটি সমাজকে চিত্রায়িত করেছেন, অর্থনৈতিক অলৌকিক উত্থানের ফলে বস্তুগতভাবে সমৃদ্ধ হলেও যে সমাজ আধ্যাত্মিকভাবে দেউলিয়া। এর মুখ্য ভূমিকায় থাকা এক দম্পতি অভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে হাজির হলেও তাদের পরস্পরের হৃদয়গত অবস্থান হাজারও মাইল দূরত্বে। চরিত্র দুটি নিজ নিজ পরকীয়ার বিষয়ে এক পারস্পরিক ও দমবন্ধ করা নীরবতায় নিমজ্জিত। এখানে একজন শিল্পপতির দেওয়া শহরতলির জমকালো পার্টিতে উচ্চবিত্ত অতিথিরা ভূতের মতো ঘুরে বেড়ায় এবং এমন হালকা খোশগল্পে মেতে ওঠে, যা শুধু তাদের গভীর একাকিত্বকেই আরও প্রকট করে তোলে। এ চলচ্চিত্রে বিচ্ছিন্নতাবোধের তৃতীয় উপাদান হিসেবে আরেক নারীর আগমন কোনো আবেগঘন অনুঘটক হিসেবে কাজ করে না; বরং এটি তাদের সত্যিকারের অনুভূতি প্রকাশ বা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার অক্ষমতার আরেকটি প্রতিচ্ছবির প্রকাশ ঘটায়।





