স্বর্ণসিংহজয়ী নারীর সঙ্গে টরন্টোতে দেখা

মায় এল-টুকি
টরন্টোর টিআইএফএফ লাইটবক্স ভবনের প্রাঙ্গণে হঠাৎ চোখে পড়ল তাকে। কোঁকড়া চুল দেখেই চিনে ফেললাম। কদিন আগেই ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণসিংহ (গোল্ডেন লায়ন) জয় করেছেন তিনি। ‘ওম্যান আননোন’ তার হাতে এনে দিয়েছে এ সম্মান। এরপরই আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পা রেখেছেন কানাডায়। তিনি ডেনমার্কের চলচ্চিত্র পরিচালক মায় এল-টুকি।
৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সেন্টারপিস বিভাগে দেখানো হয়েছে ‘ওম্যান আননোন’। একই বিভাগে ছিল বাংলাদেশের রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। টিআইএফএফ লাইটবক্স ভবনের মূল ফটকের বাইরে বাগে পেয়ে মায় এল-টুকিকে বললাম, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সাংবাদিকতা করি।’ জেনে বললেন, ‘দারুণ!’ ৪৯ বছর বয়সী এ নির্মাতাকে বললাম, ‘এবারের আসরে বাংলাদেশের একটি চলচ্চিত্র আছে। আর সেটি পরিচালনা করেছেন একজন নারী।’ তিনি হাসিমুখে আগ্রহের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, ‘কোনটি?’ সিনেমার নাম জানাতেই আশ্বাস দিলেন, ‘চলচ্চিত্রটি দেখব।’
নারী নির্মাতাদের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ প্রসঙ্গে ভেনিসে বলা মায় এল-টুকির কিছু কথা টরন্টোতে মনে পড়ে গেল, ‘নারীদের এখনো চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পুরুষদের তুলনায় বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এর প্রভাব পড়ে বাজেট, অভিনয়শিল্পী নির্বাচন এবং শেষ পর্যন্ত বড় চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা পাওয়ার ক্ষেত্রে।’
‘ওম্যান আননোন’-এর সাফল্য একদিক দিয়ে ভেনিসে একমাত্র নারী নির্মাতার অনন্য জয়। কারণ এবারের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত ২১টি সিনেমার মধ্যে নারী পরিচালকের একক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ছিল শুধু এটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে জার্মান দখলমুক্ত ডেনমার্কের পটভূমিতে নির্মিত এ চলচ্চিত্র। এর গল্প গৃহপরিচারিকা মারিকে কেন্দ্র করে। ধনী নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে। কিন্তু একজন জার্মান সেনার সঙ্গে নিজের অতীত সম্পর্ক তার নতুন জীবনের সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান দখলদার বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত ডেনিশ নারীদের প্রায়ই প্রকাশ্যে অপমান করা হতো। যুদ্ধকালীন সম্পর্কের সামাজিক কলঙ্ক দশকের পর দশক বয়ে বেড়ানো সেসব নারীর জীবনকে সামনে নিয়ে এসেছে চলচ্চিত্রটি। এতে মারি চরিত্রে অভিনয় করেছেন ম্যাথিল্ড আরসেল। ভেনিসে তিনি পেয়েছেন সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার। ফলে বিরল এক দ্বৈত সাফল্য অর্জন করেছে ‘ওম্যান আননোন’। ৩০ বছর বয়সী এ ডেনিশ অভিনেত্রী এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এমন অনেক নারী নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া এ ধরনের ঘটনা পরিবারের কাছেও কখনো বলেননি। এমনকি আজও ডেনমার্কে কেউ কেউ ভয় পান এবং নিজেদের নিয়ে লজ্জিত বোধ করেন।’
‘ওম্যান আননোন’-এর মাধ্যমে নারীকে একটি যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখিয়েছেন মায় এল-টুকি। এটি এমন নারীদের গল্প, যাদের মধ্যে আছে কণ্ঠহীন হয়ে থাকার বাস্তবতা। ভেনিস উৎসবে স্বর্ণসিংহ জয়ের ফলে অস্কারে আলোচিত হয়ে ওঠার সম্ভাবনা জাগিয়েছে ‘ওম্যান আননোন’।





