সড়কে কমেছে ব্যক্তিগত গাড়ি, কোন কারণে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় ঢাকার মধ্যবিত্তের অন্যতম স্বপ্ন ছিল ব্যক্তিগত গাড়ি। আয় কিছুটা বাড়লেই গাড়ি কেনার পরিকল্পনা করতেন অনেকে। কিন্তু নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচের কারণে এখন বদলে যাচ্ছে সে হিসাব। মধ্যবিত্তের জন্য গাড়ি কেনা এখন পরিণত হয়েছে বিলাসিতায়। এমনকি যাদের গাড়ি কেনার সামর্থ্য রয়েছে, তারাও ভাবছেন— শুধু যাতায়াতের জন্য এত বড় বিনিয়োগ ও নিয়মিত খরচ বহন করার প্রয়োজন আছে কি না।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিবন্ধন পরিসংখ্যানেও এই পরিবর্তনের প্রতিফলন স্পষ্ট। ২০১৭ সালে দেশে এক বছরে সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৯৫২টি ব্যক্তিগত গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছিল। এরপর আর সেই অবস্থায় ফিরতে পারেনি বাজার। ২০২৫ সালে নতুন ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধন নেমে এসেছে ৯ হাজার ৩৮৭টিতে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছে ৫ হাজার ৪৫৮টি। অর্থাৎ ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নতুন ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধন কমেছে ৫৭ শতাংশের বেশি।
এই পতনকে শুধু গাড়ির বাজারের সংকট হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না বলেই মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে মধ্যবিত্তের আয়-ব্যয়ের চাপ এবং ঢাকার যাতায়াতের ধরন পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্কের কথা বলছেন তারা। গাড়ি কেনার পাশাপাশি রাখার ব্যয়ও এখন বড় বিষয়। চালকের বেতন, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, মেরামত ও পার্কিং— সব মিলিয়ে মাসে নিয়মিত একটি বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে পরিবারের অন্য ব্যয়ের সঙ্গে হিসাব মিলিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িকে অনেকেই এখন স্থগিতযোগ্য ব্যয় হিসেবে দেখছেন।
ব্যক্তিগত গাড়ি কমার কারণ বলতে গিয়ে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘দেশে মধ্যবিত্ত কমে আসছে। এটার পেছনে অর্থনৈতিক কারণটা বড়। মধ্যবিত্ত পরিবার এখন আর গাড়ি কেনার কথা আগের মতো ভাবে না। কেনার খরচের চেয়ে ব্যবহারের খরচ বেশি হয়ে যাচ্ছে। আবার তাদের কাছে নিজস্ব গাড়ির চেয়ে বিকল্প পরিবহন এখন সুবিধাজনক বেশি মনে হচ্ছে।’
বিআরটিএর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১-১৭ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধনে মোটামুটি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ছিল। ২০১১ সালে ১২ হাজার ৯৪২টি গাড়ি নিবন্ধিত হয়। ২০১২ সালে তা কমে ৯ হাজার ২২০টিতে নামলেও পরের বছর থেকেই বাড়তে থাকে। ২০১৩ সালে ১০ হাজার ৪৫৬, ২০১৪ সালে ১৪ হাজার ৬৮১ এবং ২০১৫ সালে ২১ হাজার ২৯টি গাড়ি নিবন্ধিত হয়। ২০১৬ সালে সামান্য কমে ২০ হাজার ২৬৮ হলেও ২০১৭ সালে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৯৫২টিতে পৌঁছায়।
এরপর শুরু হয় পতন। ২০১৮ সালে নিবন্ধন হয় ১৮ হাজার ২২২, ২০১৯ সালে ১৬ হাজার ৭৭৯ এবং ২০২০ সালে ১২ হাজার ৪০৩টি। করোনার পর ২০২১-২২ সালে কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও তা স্থায়ী হয়নি। ২০২২ সালে ১৬ হাজার ৬৯৫টি নিবন্ধনের পর ২০২৩ সালে তা এক লাফে নেমে আসে ১০ হাজার ৭৮৪টিতে। ২০২৪ সালে ১০ হাজার ৪৯৯ এবং ২০২৫ সালে ৯ হাজার ৩৮৭টি। অর্থাৎ ২০২২-২৩ সালেই নতুন ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধন কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। এরপরও পতন অব্যাহত রয়েছে। ফলে করোনা-পরবর্তী সাময়িক সংকট দিয়ে এই প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করা কঠিন; বরং ব্যক্তিগত গাড়ির ক্রেতাদের সক্ষমতা ও অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে পরিসংখ্যান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যবিত্তের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ির বড় সমস্যা এখন শুধু কেনার খরচ নয়; গাড়ি রাখার নিয়মিত ব্যয়ও। একজন চালকের বেতনেই মাসে ১৬-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এর সঙ্গে জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও মেরামতের ব্যয় যোগ হয়। ফলে গাড়ি যতদিন রাখা হয়, ততদিনই পরিবারের ওপর এর আর্থিক চাপ থাকে। অন্যদিকে ঢাকার যানজট ও পার্কিং সংকটের কারণে গাড়ির সময়-সাশ্রয়ী সুবিধাও অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে। ফলে মধ্যবিত্তের কাছে প্রশ্নটি এখন শুধু ‘গাড়ি কেনার সামর্থ্য আছে কি না’ নয়; বরং ‘গাড়ি রাখার প্রয়োজন ও সামর্থ্য— দুটোই আছে কি না’।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিকল্প পরিবহন। রাইড শেয়ারিংয়ের বিস্তারে মোটরসাইকেল দ্রুত যাতায়াতের একটি সহজলভ্য মাধ্যম হয়েছে। প্রয়োজনের সময় মোবাইল ফোনে রাইড ডেকে গন্তব্যে যাওয়া সম্ভব হওয়ায় শুধু যাতায়াতের জন্য গাড়ি রাখার প্রয়োজন অনেকের কাছে কমেছে। একইভাবে মেট্রোরেল ঢাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের হিসাব বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে অফিসগামীদের জন্য নির্দিষ্ট রুটে তুলনামূলক দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। রিকশা ও অন্যান্য স্বল্প দূরত্বের বাহনের সঙ্গে এসব ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে গাড়ি ছাড়াই ‘প্রথম ও শেষ মাইল’ অতিক্রমের সুযোগও সৃষ্টি করেছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাইড শেয়ারিং ও গণপরিবহনের বিকল্প বাড়ায় ব্যক্তিগত গাড়ির প্রয়োজনীয়তা কিছুটা কমছে। আগে নিজের গাড়ি না থাকলে ট্যাক্সি বা গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক বিকল্প রয়েছে। ফলে গাড়ি কেনার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের পরিবর্তে প্রয়োজনের সময় পরিবহন ভাড়া করার প্রবণতা বাড়ছে। একজন যাত্রীর ক্ষেত্রে ট্যাক্সির বিকল্প হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল।
স্বাধীনতার পর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৮১৩টি ব্যক্তিগত গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সাল ছিল সর্বোচ্চ নিবন্ধনের বছর। এরপর প্রায় এক দশকে নতুন ব্যক্তিগত গাড়ির বাজার অর্ধেকের বেশি সংকুচিত হয়েছে। এই পতনের মধ্যে শুধু গাড়ি কম কেনার তথ্য নেই; রয়েছে মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের ইঙ্গিতও। একসময় আয় বাড়ার সঙ্গে গাড়ি কেনাকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ মনে করা হলেও এখন বাড়ি ভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য ও অন্যান্য ব্যয়ের সঙ্গে গাড়ির খরচও হিসাব করতে হচ্ছে। ফলে গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে গাড়ি ছাড়াই দ্রুত চলার সুযোগ বাড়ায় সে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হচ্ছে। ফলে ঢাকার যাতায়াতের হিসাব বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়ি ঘিরে মধ্যবিত্তের স্বপ্নও।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামছুল হক আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘যানজট, পর্যাপ্ত পার্কিং না থাকা, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ, চালক খোঁজা— সব মিলিয়ে এখন ব্যক্তিগত গাড়ি রাখা একটা যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। শুধু বাংলাদেশে নয়; রাইড শেয়ারিংয়ের প্রচলন হওয়ার পর গোটা পৃথিবীতেই ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানা কমতে শুরু করেছে। মানুষ এখন আর ঝামেলা নিতে চায় না। গাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক সহজে ঋণ দিচ্ছে, তবুও মানুষ তাতে আগ্রহী হচ্ছে না।’



